বুধবার, নভেম্বর ৪, ২০২৬
২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়, পরাজয়ের দায় নিতে নারাজ ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৫০ পিএম

মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়, পরাজয়ের দায় নিতে নারাজ ট্রাম্প
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচন একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ও গভীর পর্যালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির অভাবনীয় সাফল্যের বিপরীতে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির ব্যাপক বিপর্যয়ের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

 

কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো চরম রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দলের এই অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের জন্য তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে দোষারোপ করতে চান না।

 

তবে তিনি মনে করেন, সাধারণ ভোটাররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দলীয় প্রার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করতে পারেনি বলেই ব্যালটে এমন বিরূপ রায় প্রতিফলিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই নির্বাচনকে মার্কিন প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থার একটি বড় পরীক্ষা এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারক হিসেবে মূল্যায়ন করছে।

 

বুধবার, ৪ নভেম্বর মার্কিন রাজনৈতিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকোকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলীয় প্রার্থীদের সামগ্রিক ব্যর্থতা এবং দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে অত্যন্ত বিশদভাবে আলোচনা করেন।

 

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে, ব্যালট পেপারে যদি তার নিজের নাম সরাসরি অন্তর্ভুক্ত থাকত, তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। পলিটিকোকে তিনি বলেন, "আমি নিজে যদি ব্যালটে থাকতাম, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবেই জিতে যেতাম।

 

আমরা খুব সহজেই সবকিছু জিতে নিজেদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারতাম।" তার এই আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য থেকে এটি অত্যন্ত প্রতীয়মান হয় যে, তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন রিপাবলিকান দলের অন্যান্য প্রার্থীদের তুলনায় সাধারণ আমেরিকান ভোটারদের মাঝে তার নিজস্ব জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক আবেদন এখনও অনেক বেশি শক্তিশালী, অটুট এবং অনস্বীকার্য।

 

গত মাসে নির্বাচনের ঠিক আগে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীদের পক্ষে দেশজুড়ে ব্যাপক ও নিরলস নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়ে তিনি দলের কর্মী ও সমর্থকদের উজ্জীবিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন।

 

সেই সব প্রচারণামূলক বিশাল জনসভায় তিনি বারবার সাধারণ ভোটারদের উদ্দেশ্যে আবেগপূর্ণ আহ্বান জানিয়েছিলেন, তারা যেন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ধরে নেন যে ব্যালট পেপারে স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম রয়েছে। অর্থাৎ, নিজের বিপুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দলীয় প্রার্থীদের রাজনৈতিক বৈতরণী পার করার এক সুকৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

 

তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন ভোটাররা ট্রাম্পের সেই আবেগপূর্ণ আহ্বান এবং রিপাবলিকান দলের নীতিনির্ধারকদের কৌশলকে বেশ কঠোরভাবেই প্রত্যাখ্যান করেছেন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য সংবাদমাধ্যম সিএনএনের নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটরা অত্যন্ত সফলতার সাথে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস-উভয় কক্ষেরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে চলেছে।

 

ক্ষমতাসীন দলের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। এই পরাজয়ের পর দলীয় প্রার্থীদের সামগ্রিক ব্যর্থতার অন্তর্নিহিত কারণ জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে বলেন, "তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রার্থীদের পছন্দ করেনি।

 

কেবল এই ধরনের একটি সাধারণ বিষয় এখানে কাজ করেছে।" রিপাবলিকান দলের ঠিক কোন কোন প্রার্থী নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিলেন না বা কাদের দুর্বল প্রচারণার কারণে দল এত বড় ক্ষতির সম্মুখীন হলো, সে বিষয়ে তাকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল।

 

এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বলেন, "আমি কাউকে দোষ দিতে চাই না। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই যে, জানেন তো, এটি একটি খুব আকর্ষণীয় এবং শিক্ষণীয় সময় ছিল। আমি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি দেখেছি এবং তা থেকে অনেক কিছু শিখেছি।"

 

তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে নির্দিষ্ট কাউকে দোষারোপ করতে না চাইলেও, হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে বিরাজমান তীব্র ক্ষোভ এবং হতাশার চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পলিটিকো সাক্ষাৎকারের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই হোয়াইট হাউসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দলের নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীর তীব্র সমালোচনা করেন।

 

তিনি এই পরাজয়ের জন্য সরাসরি প্রার্থীদের মান বা রাজনৈতিক যোগ্যতাকে দায়ী করেছেন। ওই ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, "প্রার্থীরা নিজেদের বিজয়ের পক্ষে যতটা না কার্যকর প্রচার চালিয়েছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি এবং ভালো প্রচার চালিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

 

ব্যালটে থাকা অনেক প্রার্থীর পক্ষেই তিনি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছিলেন।" এই মন্তব্য অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, ক্ষমতাসীন প্রশাসনের ভেতরে দলীয় প্রার্থীদের রাজনৈতিক অযোগ্যতা এবং প্রচারণার দুর্বলতা নিয়ে গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

 

এদিকে, মুখে কাউকে সরাসরি দোষ না দেওয়ার কথা বললেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া একটি দীর্ঘ পোস্টে নিজের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ পুরোপুরি ধরে রাখতে পারেননি।

 

সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য টেক্সাসের প্রভাবশালী রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে সরাসরি আক্রমণ করে একটি চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন। দলের এই বিপর্যয়ের জন্য তিনি পরোক্ষভাবে অ্যাবটকে দোষারোপ করে বলেন, তিনি যদি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষ ছয় মাসে এসে হঠাৎ করে 'রাইনো' (নামেমাত্র রিপাবলিকান) না হয়ে উঠতেন, তবে তিনি কোনোভাবেই নির্বাচনে হেরে যেতেন না।

 

ট্রাম্পের এই তীক্ষ্ণ মন্তব্য দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আদর্শিক দ্বন্দ্বকে সম্পূর্ণ জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে, যা আগামী দিনে রিপাবলিকান শিবিরের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

 

নির্বাচনী ফলাফল যা-ই হোক না কেন এবং দলের ভেতরে যত বিভেদই থাকুক না কেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের বর্তমান স্পিকার মাইক জনসনের ভূমিকার ব্যাপক প্রশংসা করেছেন। এই কঠিন রাজনৈতিক সময়ে দলের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে হাউস স্পিকার মাইক জনসন একটি খুব ভালো কাজ করেছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

দলের এই চরম বিপর্যয়ের পর রিপাবলিকানদের জন্য জনসনের এখনও স্পিকার বা দলের নেতা হিসেবে থাকা উচিত কি না-সাংবাদিকদের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প অত্যন্ত পরিপক্ব রাজনৈতিক নেতার মতো উত্তর দেন। তিনি বলেন, "তাকে নিজেকেই সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে তিনি একজন অত্যন্ত ভালো ব্যক্তি এবং একজন ভালো মানুষ।"

 

সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সদ্য সমাপ্ত এই মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য একটি ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প তার মেয়াদের বাকি সময়গুলোতে বড় ধরনের আইনি, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবেন।

 

ডেমোক্র্যাটরা এখন যেকোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, বাজেট বরাদ্দ এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে সহজেই বাধা সৃষ্টি করতে পারবে। ট্রাম্পের এই মিশ্র প্রতিক্রিয়া মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন মাত্রার জন্ম দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ফলাফল আগামী দিনের মার্কিন রাজনীতিতে, বিশেষ করে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং গভীর প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তা নির্ধারণে এই নির্বাচন একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে এবং বিশ্ব রাজনীতিতেও এর ঢেউ আছড়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

- সিএনএন