বুধবার, নভেম্বর ৪, ২০২৬
২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রিপাবলিকান দলের ঐতিহাসিক বিপর্যয়, নেপথ্য কারণ ও ট্রাম্পের ভূমিকা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:১৯ পিএম

রিপাবলিকান দলের ঐতিহাসিক বিপর্যয়, নেপথ্য কারণ ও ট্রাম্পের ভূমিকা
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির অনাকাঙ্ক্ষিত ও চরম বিপর্যয় মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশজুড়ে এমনভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন, যেন তিনি নিজেই প্রতিটি আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

 

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট আসনগুলোতে তিনি নিজ হাতে দলীয় প্রার্থীদের বাছাই করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, সাধারণ মার্কিন ভোটাররা ট্রাম্পের মনোনীত সেই প্রার্থীদের পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

 

সাউথ ক্যারোলিনা, নর্থ ক্যারোলিনা, টেক্সাস এবং মিশিগানের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে গেছে।

 

একই সঙ্গে মার্কিন রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতার প্রকৃত সীমানা ও প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বহুল আলোচিত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা আমেরিকাকে পুনরায় মহান করার আন্দোলনের মাধ্যমে রিপাবলিকান পার্টিকে সম্পূর্ণ নতুন একটি রূপ দিয়েছেন।

 

দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি সবসময় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন। দলের ভেতরে যেসব রক্ষণশীল নেতা তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পুরোপুরি একমত ছিলেন না বা তার প্রতি যথেষ্ট অনুগত ছিলেন না, ট্রাম্প সুকৌশলে তাদের মূলধারা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন।

 

রাজ্যজুড়ে যেসব নেতার শক্তিশালী সাংগঠনিক যোগাযোগ ও পূর্বে নির্বাচনে জয়ের প্রমাণিত রেকর্ড ছিল, তাদের বাদ দিয়ে তিনি বারবার নিজের অন্ধ অনুগত এবং আদর্শিক মিত্রদেরই প্রার্থী হিসেবে প্রাধান্য দিয়েছেন।

 

ট্রাম্প মূলত এই বাজি ধরেছিলেন যে, তার নিজস্ব আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার জোর এবং সমর্থন প্রার্থীদের যেকোনো রাজনৈতিক দুর্বলতা বা অযোগ্যতাকে অনায়াসেই ঢেকে দিতে পারবে। কিন্তু মঙ্গলবারের ফলাফল অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছে যে, নিজের পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষে সাধারণ ভোটারদের রায় টানতে তিনি এবার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন।

 

নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রত্যাখ্যানের ঘটনাটি ঘটেছে সাউথ ক্যারোলিনায়। ১৯৯৮ সালের পর থেকে এই রাজ্যটি কখনোই কোনো ডেমোক্র্যাট দলীয় সিনেটর নির্বাচিত করেনি এবং গত ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে খোদ ট্রাম্প সেখানে আঠারো শতাংশ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।

 

এবার সেই অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্প প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন ডারলিন গ্রাহামকে সরাসরি সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু সাধারণ ভোটারদের রায়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুস সেখানে এক অভাবনীয় ও নাটকীয় জয় তুলে নিয়েছেন।

 

অন্যদিকে নর্থ ক্যারোলিনায় রিপাবলিকান পার্টির সাবেক জাতীয় প্রচার কর্মকর্তা মাইকেল হোয়াটলিকে সমর্থন করেছিলেন ট্রাম্প; যিনি সাবেক ডেমোক্র্যাট দলীয় গভর্নর রয় কুপারের কাছে শোচনীয়ভাবে হেরে গেছেন।

 

টেক্সাসে দলীয় প্রাইমারি বা প্রার্থী বাছাই নির্বাচনে ট্রাম্প সরাসরি হস্তক্ষেপ করে দলের ভেতরে নিরাপদ ও শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে পরিচিত সিনেটর জন করনিনকে সরিয়ে দিয়ে কেলেঙ্কারিতে জড়ানো অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ চূড়ান্ত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস ট্যালারিকো অনায়াসে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন; যার ফলে ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথমবারের মতো টেক্সাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে চলে গেছে।

 

মিশিগানেও ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থী ও সাবেক মার্কিন প্রতিনিধি মাইক রজার্স ডেমোক্র্যাট দলীয় তরুণ নেতা আবদুল এল-সায়েদের কাছে পরাজিত হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে আবদুল এল-সায়েদ মার্কিন সিনেটে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম মুসলিম প্রতিনিধি হিসেবে এক নতুন ইতিহাস গড়েছেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ও স্বনামধন্য জরিপ প্রতিষ্ঠান ইপসোসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ছয় জানুয়ারি মার্কিন ক্যাপিটল ভবনে হামলার পরের যে উত্তাল সময়টি ছিল, মঙ্গলবারের এই নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তার চেয়েও অনেকটা নিচে নেমে গিয়েছিল।

 

এর ফলে রিপাবলিকান দলের ভেতরেই এই আশঙ্কা অত্যন্ত জোরালো হয়ে উঠেছিল যে, দলের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠা স্বয়ং প্রেসিডেন্ট নিজেই এখন দলের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

 

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, নতুন শুল্ক নীতি এবং ইরানের সাথে সামরিক সংঘাতের কারণে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা সরাসরি ব্যালট বাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে।

 

এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রবীণ রিপাবলিকান কৌশলবিদ ডৌ হাই একে একটি 'ট্রাম্প-কম্পন' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, ট্রাম্প পুরো বছরজুড়েই ভোটারদের শুধু এটাই বোঝানোর চেষ্টা করে গেছেন, কোন বিষয়টি তার নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সাধারণ ভোটারদের কাছে প্রকৃতপক্ষে কোনটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা তিনি একবারও বোঝার চেষ্টা করেননি।

 

নির্বাচনের ফলাফল যখন একের পর এক রিপাবলিকানদের বিপক্ষে আসতে শুরু করে, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত চড়া ও অনমনীয় সুরেই নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি এই পরাজয়ের দায় নিজের কাঁধে নিতে অস্বীকৃতি জানান।

 

মঙ্গলবার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, তিনি তো সরাসরি ব্যালটে ছিলেন না, আর যদি তিনি ব্যালটে থাকতেন, তবে তারা নিশ্চিতভাবেই ভূমিধস জয় পেতেন। যদিও হোয়াইট হাউসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে জানিয়েছেন ভিন্ন কথা।

 

তিনি বলেন, ট্রাম্প মূলত ব্যালটে থাকা প্রার্থীদের নিজেদের প্রচারের চেয়েও তাদের পক্ষে অনেক বেশি এবং ভালো প্রচারণা চালিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউসের অপর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, নির্বাচনের প্রায় ছয় সপ্তাহ আগে প্রশাসনের হাতে থাকা অভ্যন্তরীণ জরিপের তথ্যে এই অশুভ ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল যে, রিপাবলিকান দল এবার প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট-কংগ্রেসের উভয় কক্ষই হারাতে বসেছে।

 

এই নিশ্চিত ভরাডুবি ঠেকাতে এবং রিপাবলিকানদের জয়ের ক্ষীণ সম্ভাবনাটুকু বাঁচাতে ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে পুরো এক মাসব্যাপী দেশজুড়ে মরীয়া হয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন। একাধিক স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে রিপাবলিকানদের এই চরম পরাজয়ের পেছনে পুরোপুরিভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভুল কৌশল এবং অদূরদর্শিতাই দায়ী।

 

আমেরিকান ইউনিভার্সিটির স্বনামধন্য অধ্যাপক থমাস কান এই প্রসঙ্গে বলেন, টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রাইমারিতে প্রেসিডেন্টের অযাচিত হস্তক্ষেপ তার দলের জন্য একটি নিশ্চিত ও নিরাপদ আসন হাতছাড়া করেছে। তার মতে, দল যদি সেখানে জনপ্রিয় সিনেটর জন করনিনকে মনোনয়ন দিত, তবে রিপাবলিকানরা নিঃসন্দেহে জয় পেত।

 

এই মার্কিন অধ্যাপক আরও মনে করেন, নর্থ ক্যারোলিনার রাজনৈতিক সমীকরণটি আরও বেশি পরিষ্কার। প্রেসিডেন্টের কর ও ব্যয়সংক্রান্ত একটি বিলে মেডিকেড বাজেট কাটছাঁটের প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি জানানোর পর ট্রাম্প তৎকালীন রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসকে প্রাইমারিতে চ্যালেঞ্জ করার প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছিলেন।

 

এই প্রকাশ্য বিরোধের জেরে থম টিলিস গত বছর ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি আর পুনর্নির্বাচনে লড়বেন না। অধ্যাপক কান বলেন, ট্রাম্প মূলত বিনা লড়াইয়ে এই আসনটি ডেমোক্র্যাটদের হাতে তুলে দিয়েছেন। থম টিলিস যদি নির্বাচনে দাঁড়াতেন, তাহলে রয় কুপার প্রার্থী হওয়ার সাহসই পেতেন না এবং আসনটি রিপাবলিকানদের হাতেই থাকত।

 

নর্থ ক্যারোলিনার সাবেক রিপাবলিকান গভর্নর প্যাট ম্যাকক্রোরিও মনে করেন যে, দলীয় প্রাইমারি বা অভ্যন্তরীণ নির্বাচনগুলোতে ট্রাম্পের অতিরিক্ত ও অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণেই একের পর এক অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান শিবির মারাত্মকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।

 

ম্যাকক্রোরি একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ টেনে বলেন, সাউথ ক্যারোলিনায় প্রেসিডেন্ট স্থানীয় দুজন অত্যন্ত প্রভাবশালী কংগ্রেস সদস্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন; যা রাজ্য পর্যায়ে দলকে চরমভাবে বিভক্ত করেছিল।

 

তিনি এটিকে এমন এক বিরল উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যেখানে একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নিজের অর্জিত রাজনৈতিক পুঁজি সম্পূর্ণভাবে নিজের দলের বিরুদ্ধেই খরচ করেছেন।

 

তবে রিপাবলিকান এই সাবেক গভর্নর সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন তৃণমূলের সেই সাধারণ শ্রমিক ও খেটে খাওয়া ভোটারদের সঙ্গে ট্রাম্পের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নিয়ে। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, এই শ্রমিক শ্রেণিই মূলত ট্রাম্পের বিশাল রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

 

ম্যাকক্রোরি আক্ষেপ করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার এক ধরনের সহজাত, আন্তরিক ও সহজ যোগাযোগ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, তিনি এখন সেই অনন্য দক্ষতাটি হারিয়ে ফেলেছেন। দেশের এবং দলের বৃহত্তর স্বার্থেই তার উচিত দ্রুত সেই সহজাত সংযোগটি আবার ফিরে পাওয়া, অন্যথায় রিপাবলিকান পার্টির জন্য ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হয়ে উঠবে।