অঙ্গরাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিনেটের ১২ নম্বর আসনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি এই যুগান্তকারী ও অভাবনীয় জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন। তার এই বিজয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে অভিবাসী, সংখ্যালঘু এবং বিশেষ করে ফিলিস্তিনি-আমেরিকানদের জন্য একটি বিশাল অনুপ্রেরণা এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের দিন যখন মোট ভোটের ৯০ শতাংশ গণনা সম্পন্ন হয়, তখনই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস আনুষ্ঠানিকভাবে আবের কাওয়াসের বিজয় ঘোষণা করে।
সেই সময় পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, তিনি মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৭৫ শতাংশ একাই লাভ করেছেন, যা তার প্রতি সাধারণ ভোটারদের বিপুল জনসমর্থনের অকাট্য প্রমাণ। এই ঐতিহাসিক ও বিপুল বিজয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু আবেগপূর্ণ প্রতিক্রিয়ায় কাওয়াস তার কর্মী-সমর্থক এবং ভোটারদের উদ্দেশ্যে লেখেন, "আমরা অবশেষে ইতিহাস গড়েছি।"
তার এই একটিমাত্র বাক্য মূলত দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের দীর্ঘ পথপরিক্রমার এক চূড়ান্ত সফলতার প্রতীক। আবের কাওয়াসের এই নির্বাচনী প্রচারণার মূল ভিত্তি ছিল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, সময়োপযোগী এবং মানবিক স্লোগান-'মর্যাদায় বিনিয়োগ, ধ্বংসের বিরুদ্ধে লড়াই'।
এই স্লোগানটি মূলত তার প্রগতিশীল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাধারণ মানুষের প্রতি তার গভীর দায়বদ্ধতারই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। তার নির্বাচনি প্রচারের 'মর্যাদায় বিনিয়োগ' অংশের মূল প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো এবং সাধারণ শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, তার স্লোগানের 'ধ্বংসের বিরুদ্ধে লড়াই' অংশটিতে মূলত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার মতো বৈশ্বিক সমস্যা, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অভিবাসীদের নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মার্কিন অর্থায়ন বন্ধের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক অবস্থানগুলো অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারায় আবের কাওয়াস নিজেকে একজন অত্যন্ত সক্রিয় সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
সম্প্রতি নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে আরেক প্রগতিশীল নেতা জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক ও বিস্ময়কর জয় পাওয়ার পর থেকে সংগঠনটির অন্যান্য সদস্যদেরও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সাফল্য এবং গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে।
এবারের সিনেট নির্বাচনে কাওয়াসের প্রতি কেবল স্থানীয় ভোটারদেরই সমর্থন ছিল না, বরং জোহরান মামদানি ছাড়াও প্রবীণ সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালাইবের মতো অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শীর্ষস্থানীয় প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট নেতারাও তার পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়েছিলেন।
শীর্ষ নেতাদের এই সমর্থন তার রাজনৈতিক ভিত্তিকে যেমন মজবুত করেছে, তেমনি তরুণ ভোটারদের মাঝেও তার গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মূলধারার রাজনীতিতে পদার্পণের অনেক আগে থেকেই আবের কাওয়াস একজন নিবেদিতপ্রাণ অধিকারকর্মী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
বিগত পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক অধিকার আদায়, অভিবাসী জনগোষ্ঠীর নানা আইনি জটিলতা নিরসন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষার জন্য একজন অত্যন্ত দক্ষ সংগঠক হিসেবে নিরলসভাবে কাজ করে আসছেন।
তার কাজের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, নিউইয়র্কভিত্তিক বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে কোনোভাবেই ইসরায়েলের দখলদারত্বকে সমর্থনকারী সংগঠনগুলোকে অর্থায়ন করতে না পারে, সে লক্ষ্যে তিনি 'নট অন আওয়ার ডাইম' নামক একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও আলোচিত প্রচারাভিযান গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
যদিও এ বিষয়ে তার প্রস্তাবিত আইনটি শেষ পর্যন্ত আইনপ্রণেতাদের বিরোধিতার কারণে আইনসভায় পাস হতে পারেনি, তবুও তার এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
আবের কাওয়াসের ব্যক্তিগত জীবন এবং তার বেড়ে ওঠার গল্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী জীবনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি নিউইয়র্কের ব্রুকলিন এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন।
তার বাবা-মা ১৯৯০-এর দশকে ফিলিস্তিন থেকে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করেছিলেন। কিন্তু অভিবাসী জীবনের এক চরম নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে, যখন তিনি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। সে সময় তার বাবাকে কোনো এক কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জর্ডানে বহিষ্কার করা হয়।
বাবার এই বহিষ্কার এবং এর ফলে পরিবারের ওপর নেমে আসা অমানবিক কষ্টের অভিজ্ঞতা তার ভবিষ্যৎ অভিবাসননীতিবিষয়ক রাজনৈতিক অবস্থানে গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি বর্তমানে নিউইয়র্কের সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে 'নিউইয়র্ক ফর অল অ্যাক্ট' পাসের পক্ষে জোরালো প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে আর কোনো অভিবাসী পরিবারকে এমন নির্মমতার শিকার হতে না হয়।
একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে বরাবরই অত্যন্ত সরব ও আপসহীন অবস্থানের কারণে আবের কাওয়াসকে নানা সময়ে মার্কিন প্রশাসনের রোষানলের শিকার হতে হয়েছে।
চলতি বছর নিউইয়র্কে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সফরের সময় তিনি এর বিরুদ্ধে আয়োজিত এক বিশাল বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং সেই বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল।
যদিও পরে ব্যাপক জনমতের চাপে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবুও এই ঘটনা তার রাজনৈতিক দৃঢ়তাকে আরও বৃদ্ধি করেছে। এ ছাড়া নিউইয়র্ক পুলিশের সঙ্গে ইসরায়েলি বিতর্কিত নজরদারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কগনাইটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ফোন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা তৈরির যে গোপন চুক্তি হয়েছিল, তিনি তার তীব্র বিরোধিতা করে সোচ্চার হয়েছিলেন।
কাওয়াস এবং অন্যান্য নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিবাদের মুখে পুলিশ শেষ পর্যন্ত ওই বিতর্কিত চুক্তি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়, যা তার রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।