আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, নবনির্বাচিত এই ডেমোক্র্যাট নেতার প্রতিষ্ঠিত নতুন এই রাজনৈতিক সংগঠনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘হাবিবি’। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সাধারণত রাজনৈতিক তহবিল গঠনের জন্য এ ধরনের সংগঠন তৈরি করার প্রথা দীর্ঘদিনের হলেও, একটি আরবি শব্দকে ব্যবহার করে এমন চমৎকার ও ব্যতিক্রমী নামকরণের ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, নবগঠিত এই হাবিবি সংগঠনটি মূলত একটি বিশেষায়িত লিডারশিপ প্যাক বা নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি, যা আবদুল এল-সায়েদের নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, আদর্শ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বা ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের (এফইসি) হালনাগাদ তথ্য, দাপ্তরিক ওয়েবসাইট এবং নথিপত্রের বরাত দিয়ে আলজাজিরা তাদের প্রতিবেদনে আরও নিশ্চিত করেছে যে, হাবিবি নামের এই প্যাকটি আবদুল এল-সায়েদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি লিডারশিপ প্যাক।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জটিল ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোতে ‘রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি’ বা পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটিকে সংক্ষেপে ‘প্যাক’ (PAC) বলা হয়ে থাকে। এগুলো মূলত এমন এক ধরনের সুসংগঠিত আইনি ও রাজনৈতিক সংস্থা, যারা মূলত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রার্থী বা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের জন্য দেশব্যাপী নির্বাচনী তহবিল বা বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করার কাজ করে থাকে।
একই সঙ্গে সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ অর্থ রাজনৈতিক প্রচার, জনমত গঠন, বিজ্ঞাপন তৈরি এবং অন্যান্য প্রার্থীর সমর্থনে আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে খরচ করার অধিকারও এসব রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটির রয়েছে।
তবে এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ্য যে, এই ধরনের লিডারশিপ প্যাক বা রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনীতিকের নিজস্ব বা ব্যক্তিগত নির্বাচনী প্রচারণার যে মূল তহবিল বা ক্যাম্পেইন ফান্ড থাকে, তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে স্বাধীন সত্তায় কাজ করে।
এর মাধ্যমে একজন সফল নেতা বা জনপ্রতিনিধি তার নিজের নির্বাচনী গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য সমমনা প্রার্থীদের আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পারেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে নিজের আদর্শিক বলয় বা প্রভাব আরও সুসংহত করার সুযোগ পান।
এল-সায়েদের এই নতুন প্যাকের নামকরণের বিষয়টি মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। ‘হাবিবি’ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয়, সুপরিচিত এবং বহুল প্রচলিত আরবি শব্দ। বাংলা ভাষায় এর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘আমার প্রিয়’ অথবা ‘আমার প্রিয়জন’।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের আরবি ভাষাভাষী মানুষের দৈনন্দিন কথোপকথনে শব্দটির ব্যবহার অত্যন্ত সাধারণ এবং এটি মূলত গভীর স্নেহ, ভালোবাসা, হৃদ্যতা ও বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি মিশ্র সংস্কৃতির দেশে, বিশেষ করে যখন দেশটিতে অভিবাসী এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার ও পরিচয় নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ চলছে, ঠিক সেই সময়ে মূলধারার রাজনীতিতে একটি আরবি শব্দের এমন প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক ব্যবহার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সাংস্কৃতিক বার্তা বহন করে।
আবদুল এল-সায়েদ তার দীর্ঘ এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিভিন্ন স্থানে জনসমক্ষে বক্তৃতা দিতে গিয়ে এই ‘হাবিবি’ শব্দটি বেশ কয়েকবার অত্যন্ত সুকৌশলে এবং আন্তরিকতার সাথে ব্যবহার করেছেন।
এর মাধ্যমে তিনি একদিকে যেমন নিজের শেকড় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতি গভীর সম্মান জানিয়েছেন, অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিদ্বেষমূলক প্রচারণার মোক্ষম জবাব দিয়েছেন কেবলই ভালোবাসার ভাষায়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং রাজনৈতিকভাবে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে তার ঐতিহাসিক নির্বাচনী বিজয়ের ভাষণে। সেই আনন্দঘন মুহূর্তে তিনি সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সকে উদ্দেশ্য করে এই ‘হাবিবি’ শব্দটি ব্যবহার করে একটি তীক্ষ্ণ অথচ মার্জিত রাজনৈতিক মন্তব্য করেন।
নবনির্বাচিত সিনেটর আবদুল এল-সায়েদ তার ভাষণে জেডি ভান্সকে সরাসরি সম্বোধন করে বলেন, “জেডি, হাবিবি, অত্যন্ত আনন্দের আয়রনি হলো, সাংবিধানিকভাবে আগামী জানুয়ারিতে আমাকে শপথ পড়ানোর জন্য আপনি বাধ্য।”
তার এই বুদ্ধিদীপ্ত ও শ্লেষাত্মক মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যেই উপস্থিত হাজারো সমর্থকের মধ্যে ব্যাপক উল্লাসের জন্ম দেয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে প্রধান শিরোনামে পরিণত হয়। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট পদাধিকারবলে মার্কিন সিনেটের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং নবনির্বাচিত সিনেটরদের আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ বাক্য পাঠ করানো তার অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব।
সেই সাংবিধানিক নিয়মের কারণেই রাজনৈতিকভাবে চরম বিরোধী ও সমালোচক হওয়া সত্ত্বেও জেডি ভান্সকে আবদুল এল-সায়েদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে তাকে শপথ পড়াতে হবে, যা মার্কিন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি দারুণ কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়।
আব্দুল এল-সায়েদের এই চূড়ান্ত বিজয়ের পেছনের গল্পটি মোটেও মসৃণ বা সহজ ছিল না। তিনি মূলত মিসরীয় অভিবাসী পিতামাতার সন্তান, যারা উন্নত জীবন ও মেধার মূল্যায়নের আশায় বহু বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
একজন সাধারণ অভিবাসীর সন্তান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভা বা কংগ্রেসে জায়গা করে নেওয়াটা তার জন্য এক অভাবনীয় ও বিশাল অর্জন। গত ৩ নভেম্বরের অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এবং প্রতিযোগিতামূলক কংগ্রেসনাল নির্বাচনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির হেভিওয়েট প্রার্থী মাইক রজার্সকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে এই ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে আনেন।
এই নির্বাচনের প্রচারণার সময় মার্কিন রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল চরম বৈরী এবং বিদ্বেষপূর্ণ। নির্বাচনের আগে আবদুল এল-সায়েদের তীব্র সমালোচনা করে প্রকাশ্যে একাধিকবার আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার রানিং মেট তথা বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স।
নির্বাচনী জনসভাগুলোতে তারা এল-সায়েদকে লক্ষ্য করে নানারকম ভিত্তিহীন অভিযোগ আনেন এবং তাকে কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই প্রকাশ্যে ‘জিহাদি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মার্কিন রাজনীতিতে একজন প্রগতিশীল মুসলিম প্রার্থীর বিরুদ্ধে এ ধরনের চরম ইসলামোফোবিক বা ইসলামভীতিমূলক শব্দ ব্যবহার করাটা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন হিসেবেই দেখা হয়।
ট্রাম্প ও ভান্সের মূল লক্ষ্য ছিল রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে সস্তা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা। কিন্তু মিশিগানের সাধারণ জনগণ এবং সচেতন ভোটাররা সেই ঘৃণামূলক ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণায় কান না দিয়ে এল-সায়েদের প্রগতিশীল নীতি, মেধা এবং যোগ্যতার ওপরই পূর্ণ আস্থা রেখেছেন।
আর ঠিক এই পেক্ষাপটেই নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর আবদুল এল-সায়েদের সেই বক্তব্যটি এত বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। যে ব্যক্তি তাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভিত্তিহীন সমালোচনা করেছেন, তাকে সন্ত্রাসী বা জিহাদি তকমা দিয়ে জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছেন, ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেই চরম সমালোচক ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সকেই এখন সম্পূর্ণ বাধ্য হয়ে এই নবনির্বাচিত মুসলিম সিনেটরকে মার্কিন সংবিধান ছুঁয়ে সম্মানজনকভাবে শপথ পাঠ করাতে হবে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন থেকে এটি স্পষ্ট যে, নতুন রাজনৈতিক সংগঠন ‘হাবিবি’ গঠনের মাধ্যমে আবদুল এল-সায়েদ প্রমাণ করেছেন যে, তিনি কেবল একবার নির্বাচিত হয়েই থেমে থাকতে চান না, বরং আগামী দিনে মার্কিন রাজনীতিতে অভিবাসী, সংখ্যালঘু এবং প্রগতিশীলদের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করতে তিনি একটি মজবুত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান।