বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্ত্রী মেলানিয়ার সম্বোধন নিয়ে কৌতুক করলেন ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:২৩ পিএম

স্ত্রী মেলানিয়ার সম্বোধন নিয়ে কৌতুক করলেন ট্রাম্প
ছবি : Collected

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে আয়োজিত এক রাজনৈতিক নির্বাচনি সমাবেশে ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘিরে বক্তব্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

নির্বাচনি প্রচারণার মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি জানান, তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প তাকে সাধারণ কোনো পারিবারিক বা আদুরে নামে ডাকেন না, এমনকি নিজের নাম ধরেও সম্বোধন করেন না; বরং তিনি সর্বদা তাকে অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে থাকেন।

 

বুধবার অঙ্গরাজ্যটির গুরুত্বপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলীয় প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের সমর্থনে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার সময় ট্রাম্প এই ব্যক্তিগত ও কৌতূহলোদ্দীপক তথ্যটি জনসমক্ষে প্রকাশ করেন।

 

তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক রাজনৈতিক আবহে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে ট্রাম্পের এই মন্তব্য উপস্থিত জনতার মাঝে ব্যাপক কৌতুকের সৃষ্টি করে, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও বিশেষ গুরুত্বের সাথে স্থান পেয়েছে।

 

টেক্সাসের এই নির্বাচনি জনসভায় দেওয়া দীর্ঘ ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দলের মনোনীত প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তথা ডেমোক্র্যাট দলীয় সিনেট পদপ্রার্থী জেমস তালারিকোকে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেন।

 

তালারিকোর ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন যে, এই ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী মূলত একজন সম্পূর্ণ নিরামিষভোজী বা উদ্ভিজ্জভোজী মানুষ, যিনি মাংস কিংবা প্রাণিজ কোনো খাবার গ্রহণ করেন না।

 

ইংরেজি ভাষায় উদ্ভিজ্জভোজী বোঝাতে ব্যবহৃত বিশেষ শব্দটির সঠিক উচ্চারণ নিয়ে কথা বলার সূত্র ধরেই মূলত সাবেক ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের প্রসঙ্গটি টেনে আনেন তিনি। ট্রাম্প অত্যন্ত সরস ভঙ্গিতে উপস্থিত দর্শকদের জানান, একবার ওই নির্দিষ্ট ইংরেজি শব্দের উচ্চারণ নিয়ে আলোচনার সময় মেলানিয়া তাকে অত্যন্ত নম্রভাবে ভুল শুধরে দিয়েছিলেন।

 

ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, মেলানিয়া তাকে সরাসরি বলেছিলেন যে তাকে একটি বিশেষ অনুরোধ রাখতে হবে এবং শব্দটি সেভাবে নয়, বরং অন্য একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে হবে। আর এই কথোপকথনের শুরুতেই মেলানিয়া তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেছিলেন বলে ট্রাম্প উল্লেখ করেন।

 

মেলানিয়ার সেই সংশোধনের স্মৃতিচারণ শেষে ট্রাম্প আবারও তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তালারিকোর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে খোঁচা দেওয়া অব্যাহত রাখেন। ব্যঙ্গাত্মক সুরে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট মন্তব্য করেন যে, তালারিকো মূলত কেবল কাঁচা সালাদ বা লেটুস পাতা খেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পছন্দ করেন।

 

এরপর তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে রাজনৈতিক কটাক্ষ করে দাবি করেন, ঐতিহ্যবাহী টেক্সাসের বৃহত্তর রক্ষণশীল ভোটারদের মন জয় করার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে তালারিকোকে সম্প্রতি লোকদেখানো মাংস খেতে হচ্ছে।

 

ট্রাম্পের দাবি অনুসারে, নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসেবে আয়োজিত বিভিন্ন উন্মুক্ত বারবিকিউ অনুষ্ঠানে গিয়ে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার কারণে তালারিকো শারীরিকভাবে চরম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

 

টেক্সাসের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে বারবিকিউ এবং মাংস জাতীয় খাবারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, আর সেই বিষয়টিকেই রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাম্প তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে জনবিচ্ছিন্ন ও কৃত্রিম হিসেবে উপস্থাপনের জোর চেষ্টা চালান।

 

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ধরনের লাগাতার প্রচারণার বিপরীতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকোর পক্ষ থেকে এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে বারবার দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তালারিকো প্রকাশ্যে কখনোই নিজেকে সম্পূর্ণ নিরামিষভোজী বা প্রাণিজ খাদ্য বর্জনকারী হিসেবে দাবি করেননি।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে মাংসের অতিরিক্ত বাণিজ্যিক ব্যবহার কিছুটা সীমিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তালারিকো পূর্বে কিছু তাত্ত্বিক মন্তব্য করেছিলেন।

 

মূলত তার সেই পরিবেশবান্ধব বক্তব্যকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে রিপাবলিকান শিবির রাজনৈতিকভাবে এই উদ্ভিজ্জভোজী তকমা দেওয়ার প্রচার শুরু করে। রিপাবলিকান শিবিরের এই ব্যক্তিগত আক্রমণের কঠোর জবাব দিয়ে তালারিকো অতীতে বহুবার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি কোনো নিরামিষভোজী নন এবং টেক্সাসের একজন সাধারণ অধিবাসী হিসেবে তিনি শৈশব থেকেই নিয়মিত ও অত্যন্ত তৃপ্তির সাথে বারবিকিউ খেয়ে জীবনযাপন করে আসছেন।

 

ব্যক্তিগত আক্রমণের এই রাজনীতির আড়ালে টেক্সাসের আসন্ন সিনেট নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও জটিল রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক একাধিক জনমত জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রিপাবলিকান শিবিরের ঐতিহ্যবাহী শক্ত ঘাঁটি টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী তালারিকো আশ্চর্যজনকভাবে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী কেন প্যাক্সটনের চেয়ে সুস্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিয়েনা কলেজের পরিচালিত সর্বশেষ এক নিরপেক্ষ নির্বাচনি জরিপে দেখা গেছে, তালারিকো ৫১ শতাংশ ভোটারের নিরঙ্কুশ সমর্থন নিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন, যেখানে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের পক্ষে সমর্থন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৫ শতাংশে।

 

প্রায় একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে প্রভাবশালী গণমাধ্যম ফক্স নিউজের পরিচালিত আরেকটি সাম্প্রতিক জরিপেও। সেই জরিপের ফলাফল অনুযায়ী তালারিকো ৫১ শতাংশ সমর্থন পেয়ে রিপাবলিকান প্রার্থীর চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন, যেখানে প্যাক্সটনের ঝুলিতে রয়েছে ৪৯ শতাংশ সমর্থন।

 

ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যটি বরাবরই রিপাবলিকান দলের এক দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। ফলে বর্তমান সময়ে ডেমোক্র্যাট দলের জন্য টেক্সাসের এই সিনেট নির্বাচনটি রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ জাতীয় প্রভাবের দিক থেকে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।

 

পরিসংখ্যানের পাতা উল্টালে দেখা যায়, টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে সর্বশেষ কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিনেট নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন সুদূর ১৯৮৮ সালে, যখন খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ লয়েড বেন্টসেন সেখানে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিলেন।

 

দীর্ঘ প্রায় চার দশক পর যদি জেমস তালারিকো এই নির্বাচনে জয়ী হতে পারেন, তবে তা হবে দেশটির সামগ্রিক রাজনীতিতে এবং বিশেষ করে টেক্সাসের মতো একটি লাল দুর্গে ডেমোক্র্যাটদের এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন।

 

এই সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়েই রিপাবলিকান দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগত হাস্যরস, তীব্র ব্যঙ্গ এবং নানা রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা অঙ্গরাজ্যটির নির্বাচনি লড়াইকে এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আবহে রূপ দিয়েছে।

 

- ইন্ডিপেন্ডেন্ট