দেশটির সেনাবাহিনীর নৌ বিভাগের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বিশ্ব বাণিজ্যের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পারস্য উপসাগরে ইরানের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর অটুট সংকল্প, নিরবচ্ছিন্ন সতর্কতা এবং সর্বোচ্চ মাত্রার সামরিক প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে উদ্ভূত নানামুখী সামরিক সংঘাত ও রাজনৈতিক উত্তেজনার পটভূমিতে ইরানের শীর্ষ নৌ কমান্ডারের এই দৃঢ়চেতা বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে ব্যাপক মাত্রায় তাৎপর্য বহন করছে।
ইরানের জাতীয় নৌবাহিনী দিবস উপলক্ষে দেশবাসী এবং সশস্ত্র বাহিনীর অগণিত সদস্যের উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ও আনুষ্ঠানিক বার্তায় রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি এই বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
তিনি তার বার্তায় সমুদ্রের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত গভীরভাবে তুলে ধরে বলেন যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক এলাকা কেবল একটি সাধারণ ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত ক্ষেত্র।
একই সঙ্গে এটি জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত করার এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রীয় শক্তিমত্তা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদর্শনের অন্যতম প্রধান মঞ্চ হিসেবে কাজ করে। আধুনিক বিশ্বে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের অনেকাংশই এই সামুদ্রিক সীমানার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে বলে তিনি তার বার্তায় জোরালোভাবে উল্লেখ করেন।
এই সুবিশাল ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সীমানার নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সামরিক বাহিনীতে কেমন জনবল এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি প্রয়োজন, সে বিষয়েও ইরানের নৌপ্রধান তার সুস্পষ্ট ও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, সমুদ্রের এই বিশাল, প্রতিকূল ও দুর্গম ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণভাবে অক্ষুণ্ন রাখার জন্য এমন একদল নিবেদিতপ্রাণ মানুষের প্রয়োজন, যাদের অন্তরে গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আধুনিক সামরিক বিজ্ঞানের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।
এই নৌযোদ্ধাদের হতে হবে মানসিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ়, অকুতোভয় এবং যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সদা প্রস্তুত। যখনই দেশের ওপর কোনো বিপদ বা সামরিক হুমকি নেমে আসবে, তখনই সামান্যতম দ্বিধা না করে এবং সর্বোচ্চ সাহসিকতার সঙ্গে তাদের যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ার অদম্য মানসিকতা থাকতে হবে বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
ইরানের নৌপ্রধান তার এই তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় পারস্য উপসাগরের সুবিশাল জলসীমায় ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ ইউনিটের দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টা এবং গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ভূমিকার কথাও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, গত কয়েক দশক ধরে এই বিশেষ নৌ ইউনিট অত্যন্ত দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও অপরিসীম নিষ্ঠার সঙ্গে পারস্য উপসাগরে তাদের পবিত্র দায়িত্ব পালন করে আসছে।
বিদেশি কোনো পরাশক্তির সামরিক সরঞ্জাম বা সহায়তার ওপর বিন্দুমাত্র নির্ভর না করে সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্ভাবনী প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং অটুট জিহাদি চেতনার ওপর ভিত্তি করে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ ইউনিট ইরানের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এক অভূতপূর্ব ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বিশেষ করে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ জলপথের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাদের এই নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা জাতীয় ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম ও অনস্বীকার্য। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও রপ্তানিকৃত জ্বালানি তেলের এক বিশাল অংশ প্রতিদিন এই অত্যন্ত সরু কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়ে বিভিন্ন মহাদেশে পৌঁছে যায়।
ফলে এই প্রণালির ওপর ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং এর নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা কেবল ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর কলকারখানা সচল রাখার জন্যই একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।
রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি তার বার্তায় মূলত এই বিষয়টিকেই অত্যন্ত সুকৌশলে ইঙ্গিত করেছেন যে, ইরান এই প্রণালির সার্বিক নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ বা আপসের কাছে নতিস্বীকার করতে প্রস্তুত নয়।
যেকোনো বিদেশি সামরিক আগ্রাসন বা অনাকাঙ্ক্ষিত ভূ-রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কঠোর হস্তে দমন করার জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এবং চৌকস নৌ ইউনিটগুলো সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ের কিছু সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি বলেন, ‘রমজান যুদ্ধ’ এবং ‘হরমুজ যুদ্ধ’ নামে পরিচিত সমসাময়িক সামরিক সংঘাতগুলোর সময় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
ওই চরম সংকটাপন্ন ও শ্বাসরুদ্ধকর সময়ে সমুদ্রযুদ্ধে অত্যন্ত দক্ষ, চৌকস ও অভিজ্ঞ ইরানি নৌযোদ্ধারা অভাবনীয় দেশপ্রেম ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মতো অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী শত্রুদের সম্মিলিত সামরিক আগ্রাসনের মুখে তারা বিন্দুমাত্র বিচলিত বা আতঙ্কিত না হয়ে সর্বোচ্চ মাত্রার সতর্কতা ও অসীম সাহসিকতার সঙ্গে নিজ দেশের পবিত্র ভূখণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষায় সীমানায় দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
তাদের সেই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র প্রতিরোধ প্রবল পরাক্রমশালী শত্রুদেরও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য করেছিল। অতীতের এই সংঘাতময় যুদ্ধগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে রিয়ার অ্যাডমিরাল ইরানি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জোর দিয়ে বলেন যে, সেই কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিগুলোতে ইরানি যোদ্ধারা সারা বিশ্বকে পুনরায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালির মতো একটি অত্যন্ত কৌশলগত, অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জলসীমার প্রকৃত নিরাপত্তা কখনোই বাইরের কোনো বিদেশি শক্তির মর্জির ওপর নির্ভর করতে পারে না।
বরং এটি সম্পূর্ণভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাহসী, দেশপ্রেমিক এবং অকুতোভয় সামরিক যোদ্ধাদের লৌহদৃঢ় সংকল্প, আত্মবিশ্বাস ও সর্বোচ্চ সামরিক প্রস্তুতির ওপরই প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল।
বহিঃশত্রুর যেকোনো ধরনের প্ররোচনা, সামরিক উসকানি বা আগ্রাসী পদক্ষেপের অত্যন্ত দ্রুত ও সমুচিত জবাব দেওয়ার জন্য ইরানের নৌবাহিনী যে সর্বদা প্রস্তুত, সেই অমোঘ বার্তাই মূলত তিনি তার এই আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও প্রতিপক্ষ দেশগুলোকে দিতে চেয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায়, ইরানের নৌপ্রধানের এই সুস্পষ্ট ও সতর্কতামূলক বার্তাটি এমন এক সংকটময় সময়ে এল, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল, পরিবর্তনশীল এবং চরম উত্তেজনাকর।
একদিকে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর নানামুখী ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত-সব মিলিয়ে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালির পার্শ্ববর্তী এলাকা এক বিপজ্জনক রূপ ধারণ করেছে।
এই জটিল প্রেক্ষাপটে রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানির এই দৃঢ়চেতা বক্তব্য মূলত বহির্বিশ্বের প্রতি ইরানের একটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট কৌশলগত বার্তা। এই বার্তার মাধ্যমে ইরান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ববাসীকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিল যে, নিজেদের পানিসীমার নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণরূপে আপসহীন ও অবিচল।
সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি স্তরের সদস্য যেকোনো মূল্যে দেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং শত্রুর যেকোনো অন্যায় হস্তক্ষেপ বা নগ্ন সামরিক আগ্রাসন সমূলে প্রতিহত করার জন্য তারা সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রস্তুত রয়েছে।