মঙ্গলবার, অক্টোবর ৬, ২০২৬
২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ওমান উপকূলে বাণিজ্যিক ট্যাংকারে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:১০ পিএম

ওমান উপকূলে বাণিজ্যিক ট্যাংকারে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে আবারও এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওমান উপকূলের সন্নিকটে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় পানামার পতাকাবাহী একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক ট্যাংকার আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও বর্বরোচিত হামলায় ট্যাংকারে কর্মরত অন্তত ১২ জন নিরীহ নাবিক গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। আহত এই নাবিকদের মধ্যে ১১ জনই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের নাগরিক বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

 

মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর সকালে সংঘটিত এই রোমহর্ষক হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই সমুদ্রপথে এমন প্রত্যক্ষ ও বেপরোয়া হামলা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, আক্রান্ত এই বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজটির নাম এমটি অন পিস। মঙ্গলবার সকালে নিজের স্বাভাবিক গতিপথে গন্তব্যের দিকে অত্যন্ত শান্তভাবে অগ্রসর হচ্ছিল পানামার পতাকায় নিবন্ধিত এই সুবিশাল জলযানটি।

 

জাহাজটি যখন ওমান উপকূলের কাছাকাছি হরমুজ প্রণালীর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর সামুদ্রিক সীমানা অতিক্রম করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই অজ্ঞাত স্থান থেকে ধেয়ে আসা একটি বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র তীব্র গতিতে এর ওপর আঘাত হানে।

 

আকস্মিক এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে জাহাজের অভ্যন্তরে ব্যাপক কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয় এবং কর্মরত নাবিকদের মধ্যে চরম মৃত্যুভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত বিবৃতি অনুযায়ী, ভয়াবহ এই হামলার সময় ওই বাণিজ্যিক ট্যাংকারটিতে মোট ১৯ জন নাবিক নিজেদের দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত ছিলেন।

 

এই ১৯ জনের মধ্যে ১৭ জনই ছিলেন ভারতীয় নাগরিক। নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতে যে ১২ জন নাবিক গুরুতর জখম হয়েছেন, তাদের মধ্যে ১১ জন ভারতীয় নাগরিক হওয়ায় বিষয়টি নয়াদিল্লির রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চরম উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ঘটনার পরপরই অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেখানে জরুরি উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়। ওমানের স্থানীয় প্রশাসনের তাৎক্ষণিক, মানবিক ও কার্যকর সহায়তায় হামলায় আহত নাবিকদের রক্তক্ষরণ ও প্রাণহানি ঠেকাতে দ্রুত উদ্ধার করে ওমানের খাসাব এলাকায় অবস্থিত একটি আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।

 

বর্তমানে সেখানে অত্যন্ত নিবিড় ও সতর্ক পর্যবেক্ষণে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে এবং তাদের শারীরিক অবস্থা নিরূপণের চেষ্টা চলছে। নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের পরিচালিত একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর এমন কাপুরুষোচিত ও প্রাণঘাতী সশস্ত্র হামলার ঘটনায় ভারত সরকার অত্যন্ত কড়া ভাষায় তীব্র নিন্দা ও আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে।

 

নয়াদিল্লির শীর্ষ পর্যায় থেকে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক জলপথে স্বাধীনভাবে চলাচলকারী কোনো বেসামরিক বা বাণিজ্যিক জলযানের ওপর এ ধরনের প্রত্যক্ষ সামরিক হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং এটি আন্তর্জাতিক মেরিটাইম আইনের সুস্পষ্ট ও চরম লঙ্ঘন।

 

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেছে যে, হরমুজ প্রণালী এবং এর আশপাশের বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে পরিচালিত এই ধারাবাহিক হামলা ভারতের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য এক গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দক্ষ নাবিক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে সুপরিচিত। আন্তর্জাতিক নৌপথে পরিচালিত বিশ্বের হাজার হাজার জাহাজে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

 

তাই সমুদ্রপথে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধাবস্থা বা নিরাপত্তা সংকট সরাসরি এই বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও জীবিকাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। এই রূঢ় বাস্তবতার আলোকে নয়াদিল্লি সমগ্র অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক ও অবিবেচনাপ্রসূত হামলা অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিবাদমান সকল পক্ষের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত যুদ্ধাবস্থা এবং বহুমাত্রিক সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে সমুদ্রপথে কর্মরত সাধারণ নাবিকদের নিরাপত্তা এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে তীব্র মাত্রায় সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালী এবং এর পার্শ্ববর্তী আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, এই নিয়ন্ত্রণহীন সংঘাতময় পরিস্থিতির জেরে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন নিরপরাধ ভারতীয় নাবিক নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অকালে প্রাণ হারিয়েছেন।

 

মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, মাত্র এক মাস আগেও ঠিক একই অঞ্চলে পণ্যবাহী অপর একটি জাহাজে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় এক তরুণ ভারতীয় নাবিক অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে নিহত হন।

 

একের পর এক সংঘটিত এমন প্রাণঘাতী ঘটনা নাবিকদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সমগ্র আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্য খাতের সঙ্গে যুক্ত অগণিত মানুষের মনে চরম মাত্রায় আতঙ্ক ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।

 

সামরিক সংঘাতের বাইরে থাকা বেসামরিক অবকাঠামো, নিরীহ নাবিক এবং পণ্যবাহী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং মানবাধিকারের চরম অবমাননা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

 

ভারত সরকার তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছে যে, বাণিজ্যিক জাহাজ, নিরীহ নাবিক এবং বেসামরিক কোনো অবকাঠামোকে কোনোভাবেই যুদ্ধের হাতিয়ার বা লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়। ভৌগোলিক ও ভূকৌশলগত দিক থেকে হরমুজ প্রণালী সমগ্র বিশ্বের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অমূল্য ও অতিমাত্রায় স্পর্শকাতর সামুদ্রিক পানিপথ।

 

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম ধমনী হিসেবে কাজ করে এই প্রণালী। প্রতিদিন বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার এক বিশাল ও অপরিহার্য অংশ এই সরু কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়ে থাকে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকে এই অমূল্য জলপথের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ এবং নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।

 

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর চলমান হামলার পেছনে বেশ কিছু জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব কাজ করছে।

 

কখনো কখনো আঞ্চলিক পরাশক্তি ইরানের সঙ্গে পূর্বানুমতি বা আগাম সমন্বয় না করার অভিযোগে, আবার কখনো জলপথে নির্ধারিত ও সম্পূর্ণ নিরাপদ নৌপথ থেকে সামান্য সরে যাওয়ার ঠুনকো অজুহাতে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজে আচমকা ও বিধ্বংসী হামলার ঘটনা ঘটছে।

 

সংঘাতের এই নতুন ও অসম ধরন বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করার এক ভয়ানক ঝুঁকি তৈরি করেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে।

 

অন্যদিকে, এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা ক্রমাগত বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক শক্তি ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বৈরিতা ও পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপগুলোও অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।

 

ইরানি সমুদ্রবন্দরগুলোকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অত্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক অবরোধ এবং ওই অঞ্চলে উপস্থিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর দেওয়া বিশেষ নির্দেশনা অমান্য করার অভিযোগে বেশ কিছু জাহাজে হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

এই দুই বৃহৎ শক্তির পাল্টাপাল্টি সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের জাঁতাকলে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে সম্পূর্ণ নির্দোষ, নিরস্ত্রীকৃত ও বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলো। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথে এমন ভীতিকর, অস্থিতিশীল ও অনিরাপদ পরিস্থিতি বিরাজ করায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো চরম আর্থিক লোকসান ও নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।

 

এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যবৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার মতো এক সর্বগ্রাসী অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা প্রবলতর হচ্ছে।

 

ভারত সরকার তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে এবং আন্তর্জাতিক জলপথে জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিরাপদ করার জন্য জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমন্বিত, কার্যকর ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

 

একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, বাধাহীন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্থিতিশীল সামুদ্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়া আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।