সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা হামলা প্রতিরোধ এবং নিজেদের ভৌগোলিক ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন এই বৃহৎ সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক মহলে মার্কিন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, কারণ বিশ্বজুড়ে এই মুহূর্তে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নজিরবিহীন চাহিদা রয়েছে এবং পেন্টাগনের হাতেও প্যাট্রিয়ট ব্যাটারির বর্তমান মজুদ বেশ সীমিত।
এই সীমিত সম্পদের মধ্যেও আরব উপদ্বীপের দুই শীর্ষ জ্বালানি রপ্তানিকারক রাষ্ট্রে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক সামরিক মাত্রায় রূপ দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক খবরাখবরের প্রভাবশালী মাধ্যম অ্যাক্সিওসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বরাতে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাময়িকী ‘মিডল ইস্ট আই’ জানিয়েছে, মার্কিন পেন্টাগন সৌদি আরবের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল একটি রাষ্ট্রীয় তেল স্থাপনার নিরাপত্তায় অতিরিক্ত একটি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ব্যাটারি মোতায়েন করেছে।
একই সমন্বিত সামরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিবেশী কাতারে অবস্থিত একটি বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে আরেকটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন।
মূলত যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাবস্থায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই দুটি রাষ্ট্রের প্রধান জ্বালানি অবকাঠামো যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত বা স্থবির না হয়, তা নিশ্চিত করাই মার্কিন সামরিক নীতিনির্ধারকদের প্রধান লক্ষ্য।
উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান রাষ্ট্র যেমন সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তারা বর্তমানে ওয়াশিংটনের অতিরিক্ত এই প্রতিরক্ষামূলক সহায়তার ওপর গভীরভাবে নির্ভর করছে।
এর মূল কারণ হলো, ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো ইরানবিরোধী বিভিন্ন সামরিক অভিযানের জেরে সমগ্র অঞ্চলে নজিরবিহীন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তেহরান।
অতীতে ঘটে যাওয়া সেই অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য যেকোনো নজিরবিহীন প্রতিশোধমূলক আক্রমণের ভয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই মিত্র দেশগুলো নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক সামরিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত আস্থা রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশেষ করে সৌদি আরবের কৌশলগত জ্বালানি অবকাঠামোগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধা এবং ইরাকভিত্তিক সশস্ত্র শিয়া মিলিশিয়া সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে যেকোনো মুহূর্তে রিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ তেল ক্ষেত্র ও শোধনাগারগুলোতে আবারও হামলা হতে পারে বলে তীব্র আশঙ্কা বিরাজ করছে।
রিয়াদের রাজকীয় নীতিনির্ধারক ও সামরিক বাহিনীর প্রধানদের কাছে এই হুমকি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর, কারণ ২০১৯ সালেও ইয়েমেনি হুথিদের ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের জাতীয় তেল কোম্পানি আরামকোর প্রধান স্থাপনাসমূহ সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছিল।
এবার ইরানের সঙ্গে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার ও নিজস্ব অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার নতুন বহর রিয়াদ ও দোহায় দ্রুত পাঠাতে বাধ্য হয়েছে পেন্টাগন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন কৌশলগত সামরিক বিন্যাস ও প্রতিরক্ষামূলক তৎপরতার পেছনে দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাম্প্রতিক ক্ষুব্ধ বক্তব্য অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন ইরানে ফের শক্তিশালী সামরিক হামলা চালানোর সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
তেহরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের উদ্দেশে অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, তেহরানকে অবিলম্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গ্রহণযোগ্য ও ‘ন্যায্য চুক্তিতে’ উপনীত হতে হবে; অন্যথায় দেশটির জন্য পরিণতি অত্যন্ত করুণ ও ক্ষতিকর হতে পারে।
ট্রাম্পের এমন প্রকাশ্য হুমকির পরেই মধ্যপ্রাচ্যের দুই শীর্ষ জ্বালানি মিত্ররাষ্ট্রে দ্রুত প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের নিশ্চিত খবর প্রকাশ পায়, যা মূল সংঘাতের প্রস্তুতিকেই স্পষ্ট করে তুলে ধরে।
আকাশসীমায় প্রতিরক্ষা প্রাচীর গড়ে তোলার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমাতেও নিজেদের সামরিক শক্তি ও নৌবহরের উপস্থিতি দ্রুত বৃদ্ধি করে চলেছে ওয়াশিংটন। বিশাল এই সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে পেন্টাগনের সরাসরি নির্দেশনায় ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’ নামের একটি পরাক্রমশালী পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো নৌঘাঁটি ত্যাগ করে সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের অভিমুখে রওনা হয়েছে।
কেবল বিমানবাহী রণতরীই নয়, এর পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার অত্যন্ত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মার্কিন মেরিন সেনাসদস্য নিয়ে তিনটি সুবিশাল উভচর যুদ্ধজাহাজের সমন্বয়ে গঠিত ‘ইউএসএস মাকিন আইল্যান্ড অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ’ ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশল বাস্তবায়নে মধ্যপ্রাচ্যের লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের পথ ধরেছে।
আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ও সংবেদনশীল সমুদ্রসীমায় ইতোমধ্যেই মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি অতি আধুনিক রণতরী-‘ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ এবং ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’ সার্বক্ষণিক টহল ও নিরাপত্তায় অবস্থান করছে।
নতুন করে যাত্রা শুরু করা ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’ রণতরীটি নির্ধারিত অঞ্চলে এসে পৌঁছালে এই ভূখণ্ডে মোতায়েনকৃত মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর মোট সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে তিনটিতে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, একই অঞ্চলের একই সমুদ্রসীমায় একযোগে তিনটি মার্কিন পারমাণবিক রণতরীর অবস্থান সাম্প্রতিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের পর এই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যে এত বিশাল আকৃতির নৌ ও আকাশ শক্তির সমাবেশ ঘটাতে যাচ্ছে মার্কিন পেন্টাগন, যা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে ইরানকে চারদিক থেকে কঠোর সামরিক চাপের মুখে রাখাই ওয়াশিংটনের বর্তমান কৌশল।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভৌগোলিক রাজনীতি বিষয়ক বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী সামরিক প্রস্তুতি মূলত একটি বহুমাত্রিক সমীকরণ বহন করছে। এটি একদিকে যেমন কাতার ও সৌদি আরবের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করে বিশ্ববাজারে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখার সর্বাত্মক নিশ্চয়তা তৈরি করছে, অন্যদিকে ইরানের মিত্র ও তাদের অনুগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করতে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও আধুনিক প্রতিরক্ষাসমূহের একটি, যা যেকোনো দিক থেকে ধেয়ে আসা ব্যালাস্টিক বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝআকাশেই নিখুঁতভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মজুদ সীমিত হওয়া সত্ত্বেও এই ব্যবস্থার অতিরিক্ত মোতায়েন প্রমাণ করে যে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংকটকে কতটা সংকটময় বলে গণ্য করছেন।
অন্যদিকে, তেহরান সরকারও বিশ্ববাসীকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে, তাদের সার্বভৌমত্ব বা ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর যেকোনো মার্কিন বা ইসরায়েলি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও অভাবনীয় সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই তড়িঘড়ি প্রতিরক্ষা মোতায়েন আঞ্চলিক শান্তির সম্ভাবনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো শঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যদি অসাবধানতাবশত কোনো পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘর্ষ বেধে যায়, তবে তা কেবল জ্বালানি খাতের ওপরই প্রভাব ফেলবে না, বরং বিশ্বজুড়ে চরম অর্থনৈতিক মন্দা ও নতুন মানবিক সংকট তৈরি করবে।
পরিশেষে, সৌদি আরব ও কাতারে কৌশলগত প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যাটারি মোতায়েন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন নিজেদের মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক ভিত্তি সুরক্ষার জোরালো প্রয়াস চালাচ্ছে, তেমনি একই সঙ্গে নৌ ও বিমানবাহিনীর বিশাল উপস্থিতি ঘটিয়ে সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার চেষ্টা করছে।
পরিস্থিতির কূটনৈতিক সমাধান দ্রুত নিশ্চিত না হলে, ২০২৬ সালের এই বৈশ্বিক সামরিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক অনির্দিষ্ট ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।