বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১, ২০২৬
১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবের সুরক্ষায় কোনো আপস নয়, কঠোর পদক্ষেপের হুশিয়ারি সালমানের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম

সৌদি আরবের সুরক্ষায় কোনো আপস নয়, কঠোর পদক্ষেপের হুশিয়ারি সালমানের
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব ভূরাজনীতিতে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল, পরিবর্তনশীল ও উত্তাল সময়ের মধ্য দিয়ে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গন পরিচালিত হচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো ধরনের নমনীয়তা বা ছাড় দেওয়া হবে না বলে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।

 

সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, বহুমুখী অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার সুদৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি রিয়াদ সরকারের কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের কথা বিশ্ববাসীর সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

 

বুধবার রাজধানীর রিয়াদে শরা কাউন্সিলের নবম অধিবেশনের তৃতীয় বর্ষের এক ঐতিহাসিক ও জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিগত বক্তব্য প্রদান করেন।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে তার এই ভাষণকে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির জটিল সমীকরণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে।

 

উদ্বোধনী ভাষণে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রসঙ্গ অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য বন্ধুভাবাপন্ন ও সুশীল রাষ্ট্রগুলোকে লক্ষ্য করে সম্প্রতি যে সমস্ত উসকানিমূলক ও সন্ত্রাসী হামলা পরিচালিত হয়েছে, তা সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর এবং অগ্রহণযোগ্য হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা এবং নাগরিকদের সুরক্ষার প্রশ্নে রিয়াদ সরকার কখনোই কোনো প্রকার আপস করবে না বলে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন। যদিও সৌদি আরব সর্বদা আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন, পারস্পরিক সদ্ভাব বজায় রাখা এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো জটিল সংকটের স্থায়ী সমাধানের পক্ষে অত্যন্ত ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তবুও যদি জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে সামান্যতম হুমকি বা আগ্রাসী হামলা আসে, তবে তার উপযুক্ত জবাব দিতে এবং কঠোরতম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে রিয়াদ প্রশাসন বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না।

 

এই দ্ব্যর্থহীন ও কঠোর হুশিয়ারির মাধ্যমে তিনি সম্ভাব্য আক্রমণকারী ও অশুভ শক্তিগুলোর কাছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, পরিষ্কার ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত বার্তা প্রেরণ করেছেন। আঞ্চলিক ও বৈশাল অংশীদারদের সঙ্গে কৌশলগত সামরিক সহযোগিতা জোরদার করার অংশ হিসেবে সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে সম্পাদিত ঐতিহাসিক ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যুবরাজ।

 

তিনি জানান যে, এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল সাধারণ সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পারস্পরিক যৌথ প্রচেষ্টার একটি অনন্য ও সফল রূপায়ণ।

 

এর পাশাপাশি, উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গেও নিরন্তর যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও যৌথ সামরিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে, যাতে যেকোনো বাহ্যিক হুমকি সম্মিলিতভাবে সফলতার সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।

 

আন্তর্জাতিক জলপথের নিরাপত্তা রক্ষা, সমুদ্র বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ বজায় রাখা এবং নৌপথের যেকোনো ধরনের জলদস্যুতা বা নাশকতা রোধ করতে একটি শক্তিশালী ‘বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট’ গঠনের উদ্যোগও বর্তমানে অত্যন্ত সফলতার সাথে এগিয়ে চলছে বলে তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন।

 

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সৌদি আরবের অবিচল, দায়িত্বশীল ও অনন্য ভূমিকার কথা অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে তুলে ধরেছেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।

 

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান ভয়াবহ ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বহুমুখী যুদ্ধাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যখন এক ধরনের চরম অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে, তখনো সৌদি আরব অত্যন্ত পরিপক্বতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে চলেছে।

 

বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতি বা অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে রিয়াদের এই কার্যকর ও সময়োপযোগী অবদান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ও সমাদৃত হচ্ছে।

 

তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানান যে, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্থায়িত্ব রক্ষায় সৌদি আরব অতীতেও তার আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে অব্যাহত রাখবে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট এবং ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় চলমান বর্বরোচিত সহিংসতার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সৌদি যুবরাজ। ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষের ওপর চলা অব্যাহত নিপীড়ন, হত্যাযজ্ঞ ও অমানবিক অবরোধের অবসান ঘটাতে এবং একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানোর জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশ্ব মোড়ল এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি অত্যন্ত কার্যকর, জোরালো ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের উদাত্ত আহ্বান জানান।

 

একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও পূর্ণাঙ্গ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ব্যতিরেকে মধ্যপ্রাচ্যে কখনো স্থায়ী শান্তি, ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে না-এই ঐতিহাসিক ও অনস্বীকার্য সত্যটি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের স্বাধীনতা সংগ্রামে সৌদি আরবের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও নৈতিক সমর্থন আমৃত্যু অব্যাহত রাখার সুদৃঢ় ঐতিহাসিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

 

ইয়েমেন ও সুদানের চলমান সংকটের বিষয়েও নিজের সুচিন্তিত ও ভারসাম্যপূর্ণ মতামত অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় তুলে ধরেছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈধ সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীদের যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক ও অস্থিতিশীল তৎপরতা কঠোরহস্টে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে সৌদি আরব তাদের ভ্রাতৃপ্রতিম সমর্থন ও সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

একই সঙ্গে, আফ্রিকার ভূ-কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র সুদানের অখণ্ডতা রক্ষা, জাতীয় ঐক্য সুসংহত করা, দেশের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বৈধ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যেকোনো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গঠনমূলক উদ্যোগে সৌদি আরব সর্বদা পাশে থাকবে বলে তিনি অত্যন্ত জোরালো আশ্বাস প্রদান করেন।

 

আঞ্চলিক শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার এই সংকটাপন্ন রাষ্ট্রগুলোতে সৌদি আরবের এই সক্রিয়, মানবিক ও ইতিবাচক ভূমিকা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে অত্যন্ত প্রশংসিত ও সমাদৃত হচ্ছে।

 

দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক অভাবনীয়, গতিশীল ও গৌরবোজ্জ্বল চিত্র অত্যন্ত সগর্বে তুলে ধরে যুবরাজ জানান যে, সুদূরপ্রসারী ‘ভিশন ২০৩০’-এর সফল বাস্তবায়নের ফলে বিগত এক দশকে সৌদি আরবের জাতীয় অর্থনীতিতে এক অভুতপূর্ব ও বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

 

২০১৬ সালের মূল কাঠামোর সঙ্গে বর্তমান সময়ের বাস্তব তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এই সময়ের ব্যবধানে সৌদির তেলবহির্ভূত রপ্তানি বাণিজ্য ১৫৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতিকে একসময়কার এককভাবে জ্বালানি তেলনির্ভর দুর্বলতা থেকে মুক্ত করে একটি বহুমুখী, আধুনিক ও শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

 

পাশাপাশি, দেশের সার্বিক জাতীয় অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের কার্যকর অবদান ও অংশগ্রহণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে শতকরা একান্ন ভাগে অর্থাৎ ৫১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের গভীর আস্থা এবং বর্তমান ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের সবচেয়ে বাস্তব ও অকাট্য প্রমাণ।

 

প্রযুক্তির আধুনিক ও ডিজিটাল যুগে দেশকে বিশ্বমঞ্চে আরও অনেক বেশি এগিয়ে নেওয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ঘোষণা করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান অত্যন্ত উদ্দীপনামূলক ও যুগান্তকারী ঘোষণা দেন যে, বর্তমান ২০২৬ সালকে সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বছর’ বা ‘এআইয়ের বছর’ হিসেবে উদযাপন করছে।

 

বিশ্বমঞ্চে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সর্বময় নেতৃত্বে নিজেদের সর্বোচ্চ ও গৌরবোজ্জ্বল আসনে অধিষ্ঠিত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে বিশাল অঙ্কের মূলধন বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হচ্ছে।

 

দেশের উদীয়মান তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ, প্রস্তুত ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলার মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব অর্জনের এই সাহসী স্বপ্ন সৌদি আরবকে এক নতুন, আধুনিক ও উন্নত উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছেন।

 

পরিশেষে, যুবরাজের এই সুদূরপ্রসারী, ভারসাম্যপূর্ণ ও অত্যন্ত সময়োপযোগী ভাষণ কেবল সৌদি আরবের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ শক্তিরই অকাট্য পরিচায়ক নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে দেশটির ক্রমবর্ধমান দায়িত্বশীল, প্রভাবশালী ও নেতৃত্বসুলভ অবস্থানেরই এক জীবন্ত ও ঐতিহাসিক দলিল।

 

- আরব নিউজ