বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১, ২০২৬
১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনীর চূড়ান্ত প্রত্যাহার

‘ঐতিহাসিক বিজয়’ আখ্যা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতায় জোর ইরানের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম

‘ঐতিহাসিক বিজয়’ আখ্যা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতায় জোর ইরানের
ছবি : Collected

দীর্ঘ তেইশ বছরের এক রক্তক্ষয়ী, সংঘাতপূর্ণ ও অত্যন্ত জটিল অধ্যায়ের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত রাষ্ট্র ইরাক থেকে নিজেদের সর্বশেষ সেনাসদস্যকেও সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

 

গত বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি সুদীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক সমীকরণের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটল। মার্কিন বাহিনীর এই চূড়ান্ত ও সামগ্রিক সেনা প্রত্যাহারের ঘটনাটিকে একটি যুগান্তকারী ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে অত্যন্ত জোরালোভাবে আখ্যায়িত করেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানের শক্তিশালী ও অভিজাত সামরিক বাহিনী ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি।

 

বৃহস্পতিবার এক আনুষ্ঠানিক ও সুদীর্ঘ বিবৃতির মাধ্যমে ইরানের এই চৌকস সামরিক ইউনিটটি তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানিয়েছে যে, পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি ছিল সম্পূর্ণভাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী এবং এই অঞ্চল থেকে তাদের চিরতরে বিদায় নেওয়াটা ছিল সময়ের সবচেয়ে বড় ও যৌক্তিক দাবি।

 

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিশ্লেষণে আইআরজিসি-এর এই বিবৃতিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে প্রেরিত ওই বিশেষ বিবৃতিতে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই মধ্যপ্রাচ্য ও এর আশপাশের অঞ্চলগুলো সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে যেতে হবে।

 

আঞ্চলিক নিরাপত্তার একটি নতুন রূপরেখা তুলে ধরে তারা জোর দিয়ে বলেছে, এই অঞ্চলের দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সার্বিক দায়িত্ব এবং ব্যবস্থাপনা সেই দেশগুলোকেই নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে হবে।

 

বাইরের কোনো পরাশক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ কখনোই এই অঞ্চলের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি। বিবৃতিতে অত্যন্ত কঠোর সমালোচনা করে বলা হয়, গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা মার্কিন বাহিনীর এই বেআইনি দখলদারিত্ব অত্যন্ত নগ্নভাবে বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করেছে যে, তাদের এই দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতি পশ্চিম এশিয়ায় বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা বা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

 

বরং, শান্তিরক্ষার নামে তারা এই অঞ্চলে কেবল অনিরাপত্তা, চরমপন্থি সন্ত্রাসবাদ এবং এক অন্তহীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার বীজ বপন করেছে। ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুদীর্ঘ দখলদারিত্বের ভয়াবহ প্রভাব কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং অর্থনৈতিক ও মানবিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই তা ছিল অত্যন্ত বিপর্যয়কর ও ধ্বংসাত্মক।

 

এই মর্মান্তিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে ইরানের বিপ্লবী গার্ড তাদের বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করেছে যে, গত দুই দশক ধরে চলা পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপ ইরাকের আপামর জনসাধারণের জীবনযাত্রাকে চরম দুর্বিষহ করে তুলেছিল।

 

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখার যে চড়া মূল্য উভয় পক্ষকে চোকাতে হয়েছে, তার একটি পরিসংখ্যানগত চিত্রও আইআরজিসি তুলে ধরেছে। তারা দাবি করেছে, দীর্ঘ বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চালানো এই সামরিক হস্তক্ষেপে স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব প্রায় পাঁচ হাজার সেনাসদস্যের প্রাণ হারিয়েছে বলে যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তা প্রকৃত সত্যের তুলনায় নিতান্তই সামান্য এবং এটি বাস্তব ও বৃহত্তর ক্ষয়ক্ষতির একটি খণ্ডিত চিত্র মাত্র।

 

একই সঙ্গে প্রায় চার ট্রিলিয়ন বা চার লাখ কোটি মার্কিন ডলারের মতো বিপুল পরিমাণ অর্থ ধ্বংসাত্মক এই যুদ্ধে ব্যয় করার পরও, চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে যুক্তরাষ্ট্রকে কেবল ইরাকি জনগণের তীব্র ঘৃণা, ক্ষোভ এবং ধিক্কার নিয়েই সেদেশ থেকে চরম অপমানজনকভাবে বিতাড়িত হতে হয়েছে। এটি পরাশক্তিগুলোর জন্য এক বিরাট ঐতিহাসিক শিক্ষা।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রাপ্ত তথ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও, ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পতনের লক্ষ্যে ইরাক দখল করার পর থেকে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে দেশটিতে মার্কিন বাহিনীর অবস্থান ছিল এক চরম বিতর্কিত বিষয়।

 

মার্কিন প্রশাসনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরাকে চালানো প্রাথমিক সামরিক হামলা এবং এর পরবর্তী দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানের জন্য মার্কিন কোষাগার থেকে প্রায় তিন ট্রিলিয়ন বা তিন লাখ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে।

 

এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে, প্রাণহানির পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ভাষ্যমতে, এই সুদীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তাদের প্রায় সাড়ে তিন হাজার অকুতোভয় সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।

 

এর পাশাপাশি, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত শত শত বেসামরিক ঠিকাদার বা কন্ট্রাক্টরও এই বিভীষিকাময় সংঘাতের বলি হয়ে নিজেদের অমূল্য প্রাণ হারিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুদ্ধাহত হাজার হাজার সেনার শারীরিক ও মানসিক যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক ও মানবিক মূল্য কোনো পরিসংখ্যান দিয়েই পরিমাপ করা সম্ভব নয়।

 

এই ঐতিহাসিক সেনা প্রত্যাহারের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে আজ থেকে দুই দশকেরও বেশি সময় আগে। ২০০৩ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র বাহিনী গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কাল্পনিক অভিযোগে ইরাকে সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছিল, তখন তাদের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল দেশটিতে একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

 

কিন্তু বাস্তবতা প্রমাণ করেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। সাদ্দাম সরকারের পতনের পর দেশটিতে যে বিশাল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা পূরণ করতে মার্কিন বাহিনী চরমভাবে ব্যর্থ হয়। ফলশ্রুতিতে, ইরাক পরিণত হয় বিভিন্ন চরমপন্থি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এক অভয়ারণ্যে।

 

শিয়া-সুন্নি সাম্প্রদায়িক সংঘাত, আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং পরবর্তীতে ইসলামিক স্টেটের মতো ভয়ংকর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান পুরো দেশটিকে এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছিল। ইরানের বিপ্লবী গার্ড মূলত এই ঐতিহাসিক সত্যটির দিকেই ইঙ্গিত করে বলেছে যে, মার্কিন উপস্থিতি সন্ত্রাসবাদ দমনের পরিবর্তে বরং নতুন নতুন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে এবং পুরো অঞ্চলকে এক অন্তহীন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 

মার্কিন বাহিনীর এই আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত বিদায়ের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরাকের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে। একটি দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশি সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকার পর ইরাকের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী এবং সেনাবাহিনী কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের মাতৃভূমির সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করতে পারবে, তা এখন এক বড় পরীক্ষার সম্মুখীন।

 

তবে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরান এই শূন্যস্থানটিকে নিজেদের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের একটি মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরান সব সময়ই মার্কিন উপস্থিতির ঘোর বিরোধী ছিল এবং এই প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্যের বাস্তবায়ন ঘটেছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন বাহিনীর অনুপস্থিতিতে বাগদাদের ওপর তেহরানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক প্রভাব আগামী দিনগুলোতে আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসবে, যা পশ্চিমা মিত্রদের জন্য নতুন ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করবে।

 

পরিশেষে, ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সামরিক রদবদল নয়, বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির এক ঐতিহাসিক পালাবদল। দীর্ঘ তেইশ বছর পর ইরাকের আকাশে আজ কোনো বিদেশি যুদ্ধবিমান বা ড্রোন টহল দিচ্ছে না, দেশটির রাজপথে বিদেশি সাঁজোয়া যানের কোনো মহড়া নেই।

 

এটি যেমন ইরাকি জনগণের জন্য একটি নবজাগরণের সুযোগ, ঠিক তেমনি এটি পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির একটি চূড়ান্ত ব্যর্থতারও স্মারক। শত সহস্র নিরীহ মানুষের রক্ত, লাখো মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া এবং ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থ শ্রাদ্ধ করার পর অবশেষে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রটিকে উপলব্ধি করতে হয়েছে যে, অস্ত্রের জোরে কখনো কোনো জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে চিরতরে দাবিয়ে রাখা যায় না।

 

এখন দেখার বিষয়, বিদেশি হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন ও সার্বভৌম ইরাক নিজেদের দেশের পুনর্গঠন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপন এবং অর্থনৈতিক মুক্তির পথে কীভাবে এগিয়ে যায়। এই নতুন পথচলায় তারা কতটা সফল হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শান্তি ও স্থিতিশীলতা।

 

- আল জাজিরা