আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে জানা গেছে, অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এই বিশাল আর্থিক প্রতারণার মাধ্যমে তুরস্কের প্রায় পাঁচ লাখ সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে সর্বস্বান্ত করা হয়েছে।
ভুয়া ও সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত একাধিক বিনিয়োগ ফান্ডের প্রলোভন দেখিয়ে শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার সমপরিমাণ, হাতিয়ে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ ও প্রভাবশালী চক্র।
এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা তুরস্কের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এক গভীর ও বহুমুখী রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
দেশটির আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যখন এই বিশাল প্রতারণার বিষয়টি অনুধাবন করতে পারে, তখন পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। কেলেঙ্কারির বিষয়টি জনসমক্ষে আসার পরপরই তুরস্কের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে অন্তত ১৩০টি সন্দেহভাজন বিনিয়োগ ফান্ড একসঙ্গে চিরতরে বন্ধ ঘোষণা করে দেয়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপের ফলে স্বাভাবিকভাবেই শেয়ারবাজারে এক মারাত্মক ও অভাবনীয় ধস নেমে আসে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে বাজারে শেয়ার বিক্রির হিড়িক পড়ে যায় এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষ চোখের সামনে তাদের সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ নিমেষেই শূন্য হয়ে যেতে দেখেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধসের প্রভাব তুরস্কের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রাথমিক তদন্ত ও বাজার বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে এই সুপরিকল্পিত প্রতারণার পেছনের মূল কৌশলগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
জানা গেছে, অভিযুক্ত ফান্ডগুলো শেয়ারবাজারে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কৃত্রিম কারসাজির আশ্রয় নিয়েছিল। তারা সুনির্দিষ্ট কিছু কম দামের বা দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ার বিপুল পরিমাণে কিনে বাজারে কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি করত এবং পরবর্তীতে নিজেদের মধ্যে কেনাবেচার মাধ্যমে সেই শেয়ারগুলোর দাম অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দিত।
সাধারণ ও অনভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করার জন্য এই ফান্ডগুলো অবিশ্বাস্য সব লাভের খতিয়ান প্রদর্শন করত। উদাহরণস্বরূপ তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি নির্দিষ্ট বিনিয়োগ ফান্ড মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দেড় হাজার শতাংশের বেশি কাল্পনিক মুনাফা দেখিয়ে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করতে প্রলুব্ধ করেছিল।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষ দ্রুত আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ার আশায় এই ফাঁদে পা দেন এবং নিজেদের সর্বস্ব বিনিয়োগ করেন। তবে এই ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ আর্থিক প্রতারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিকভাবে চরম প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গভীর যোগসাজশের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
তদন্তকারী সংস্থাগুলো বেশ কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজ ও বিতর্কিত ফান্ডের পরিচালনা পর্ষদের নথিপত্র ঘেঁটে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সাবেক ও বর্তমান একাধিক প্রভাবশালী উপদেষ্টা, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন পদাধিকারী এবং ক্ষমতাধর মন্ত্রীদের নিকটাত্মীয়দের নাম খুঁজে পেয়েছে।
রাষ্ট্রযন্ত্রের একেবারে উচ্চস্তরের ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ ছাড়া এত বড় মাত্রার আর্থিক কেলেঙ্কারি বছরের পর বছর ধরে নির্বিঘ্নে পরিচালিত হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে বিশ্লেষকরা জোরালো মত প্রকাশ করেছেন। এই তথ্য প্রকাশের পর তুরস্কের সাধারণ জনগণের মধ্যে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।
কেলেঙ্কারির মাত্রা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তীব্র আকার ধারণ করলে ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও অস্থিরতা শুরু হয়। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একেপি) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী এবং সাবেক মন্ত্রী ফাতেমা বেতুল সায়ান কায়া চরম চাপের মুখে পড়ে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দলীয় ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর ও নৈতিকভাবে স্খলনজনিত। অভিযোগ রয়েছে যে, শেয়ারবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপের কারণে ধস নামার বিষয়টি তিনি তার অভ্যন্তরীণ প্রভাব খাটিয়ে আগেই জানতে পেরেছিলেন।
আর এই গোপন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাজার পুরোপুরি ধসে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও চড়া দামে নিজের নামে থাকা সমস্ত শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়ে নিজেকে নিরাপদ করেছেন।
একজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদের এমন ইনসাইডার ট্রেডিং বা অভ্যন্তরীণ তথ্য পাচারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ফায়দা লোটার বিষয়টি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুনে রীতিমতো ঘি ঢেলে দিয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং জনরোষ প্রশমিত করতে তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে। ইতোমধ্যে এই বিশাল প্রতারণা চক্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একাধিক বিনিয়োগ ফান্ডের চেয়ারম্যান, শীর্ষ নির্বাহী এবং দায়িত্বশীল অনেক কর্মকর্তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তুরস্কের বর্তমান উপ-অর্থমন্ত্রীর আপন জামাতার গ্রেপ্তারের খবরটি। তদন্তকারীদের দাবি, উপ-অর্থমন্ত্রীর এই নিকটাত্মীয় একটি অত্যন্ত বিতর্কিত শেয়ার কারসাজির ঘটনায় নেপথ্যের মূল কারিগর বা মাস্টারমাইন্ড হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিলেন।
তার এই গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রতারণার জাল প্রশাসনের কত গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযান এখনো চলমান রয়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে আগামী দিনগুলোতে আরও অনেক রাঘববোয়াল এই তদন্তের জালে আটকা পড়বেন।
রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের চায়ের আড্ডায় এখন কেবল এই ১৭ বিলিয়ন ডলারের কেলেঙ্কারির বিষয়টিই প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমশ রাজনৈতিকভাবে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান স্বয়ং জনসমক্ষে এসে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।
একটি জাতীয় সম্প্রচারে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে বলেছেন যে, যারা সাধারণ জনগণের রক্তঘামে অর্জিত কষ্টের টাকায় হাত দিয়েছে, তারা যত প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধরই হোক না কেন, তাদের কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করার পাশাপাশি দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের প্রমাণ দিতে তিনি প্রশাসনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করারও আশ্বাস দিয়েছেন।
প্রতারণার শিকার হওয়া লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর ক্ষোভ প্রশমিত করতে এবং বাজারে পুনরায় আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে তুরস্কের আর্থিক কর্তৃপক্ষ আগামী ছয় মাসের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এই সময়ের মধ্যে প্রতারিত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের একটি যৌক্তিক কাঠামো তৈরি করা হবে।
তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা সরকারের এই আশ্বাসের বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শেয়ারবাজারের ধসে যে বিপুল পরিমাণ কাগজের সম্পদ বা কাল্পনিক মূল্য বাষ্পীভূত হয়ে গেছে, তার বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।
যেসব অর্থ অপরাধীরা পাচার করেছে বা সরিয়ে ফেলেছে, তা পুরোপুরি উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। ফলে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সাধারণ মানুষ হয়তো তাদের হারানো মূলধনের খুব সামান্য একটি অংশই ফেরত পেতে পারেন, যা তাদের জীবনে নেমে আসা আর্থিক বিপর্যয় কাটাতে কোনোভাবেই যথেষ্ট হবে না।
এই বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের জন্য এমন এক সময়ে আবির্ভূত হয়েছে, যা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন একটি পরীক্ষা বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টি হলো, যে পাঁচ লাখ বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়েছেন, তাদের একটি বিশাল অংশই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের দল একেপি-এর কট্টর ও একনিষ্ঠ সমর্থক গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। যারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জুগিয়ে এসেছেন, আজ তারাই সরকারি প্রভাবশালীদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে পথে বসেছেন।
আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বিশাল সংখ্যক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও তাদের পরিজনদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশা ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য একটি চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে তুরস্কের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা এরদোয়ান সরকার এর আগে অনেক রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে মোকাবিলা করলেও, নিজ দলের প্রভাবশালী নেতাদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে সৃষ্ট এই বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাসভঙ্গের এই ঘটনা আগামী রাজনৈতিক ময়দানে তার জন্য সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলেই আন্তর্জাতিক মহল গভীরভাবে বিশ্বাস করে।