মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর নিয়ে প্রকাশিত সব খবর ভিত্তিহীন: নেতানিয়াহু

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:০০ পিএম

সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর নিয়ে প্রকাশিত সব খবর ভিত্তিহীন: নেতানিয়াহু
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত একটি স্পর্শকাতর গণমাধ্যমের প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভিত্তিহীন বলে জোরালোভাবে উড়িয়ে দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

 

সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর নিয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে যে নানা গুঞ্জন ও চাঞ্চল্যকর খবর ছড়িয়ে পড়েছিল, তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে যে, ওই সফর সম্পর্কিত প্রতিটি দাবিই বানোয়াট এবং সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

 

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং দীর্ঘদিনের বৈরিতা দূর করে কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলানোর এই অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রক্রিয়ার মধ্যে এ ধরনের অসত্য সংবাদ পরিবেশন দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করার একটি সুদূরপ্রসারী অপচেষ্টা হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অভিজ্ঞ বিশ্লেষকরা।

 

প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট মনিটর’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনের সূত্র ধরে এই তথ্য আন্তর্জাতিক মহলে ছড়িয়ে পড়ে, যা বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

এই সামগ্রিক বিতর্কের মূল সূত্রপাত হয়েছিল মূলত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর সংবাদকে কেন্দ্র করে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের ভূখণ্ডে নজিরবিহীন ও মারাত্মক হামলার ঠিক পূর্বেই নাকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে সম্ভাব্য এই বড় ধরনের আক্রমণ সম্পর্কে আগাম সতর্ক করেছিলেন।

 

শুধু তাই নয়, ওই প্রতিবেদনে আরও অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি দাবি উপস্থাপন করে বলা হয়েছিল যে, এই ধরনের গোয়েন্দা তথ্য আগে পাওয়ার পরও তা প্রতিরোধে ব্যর্থতার দায় কিংবা অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই বিষয় যাতে জনসমক্ষে প্রকাশিত না হয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলি সরকারের জন্য রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সংকটের কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই নাকি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গোপনে আমিরাত সফর করেছিলেন এবং আমিরাতের রাষ্ট্রপ্রধানকে এই খবর ধামাচাপা দিতে বা সর্বসমক্ষে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন।

 

এই ধরনের অত্যন্ত গুরুতর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দাবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর পরই বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং চারদিকে নানা ধরনের গোপনীয় সমীকরণের ডালপালা গজাতে শুরু করে।

 

এই তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠার পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে একটি অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক ও কঠোর বিবৃতি প্রদান করা হয়। ওই বিবৃতিতে গণমাধ্যমের প্রকাশিত দাবিগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট হিসেবে আখ্যায়িত করে পরিষ্কার ভাষায় বলে দেওয়া হয় যে, এই খবরের সাথে বাস্তবতার বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক নেই।

 

নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানানো হয়েছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাঁর সাম্প্রতিক সফরের মূল এবং একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও বেশি সুদৃঢ় করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান জটিল আঞ্চলিক বিভিন্ন নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে পারস্পরিক আলোচনা পরিচালনা করা।

 

ওই সফরে এমন কোনো স্পর্শকাতর, কাল্পনিক বা অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে বিন্দুমাত্র আলোচনা হয়নি, যার সাথে গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের সামান্যতম মিল থাকতে পারে। ইসরায়েলি প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হীন স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট মহল থেকে এই ধরনের অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও প্রোপাগান্ডামূলক তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতির মৌলিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী এবং কোনোভাবেই তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

 

এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এই ধরনের জোরালো ও স্পষ্ট অস্বীকারের পর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী এবং উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকেও কূটনৈতিক শালীনতা ও পরিপক্বতা বজায় রেখে এই বিষয়ে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।

 

আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ও উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছে যে, তারা এই নির্দিষ্ট ও বিতর্কিত সংবাদ বা বিভিন্ন মহলের অহেতুক গুঞ্জন নিয়ে সরাসরি বা বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি নয়।

 

তবে দেশটির পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুকৌশলী ও স্পষ্ট ভাষায় এই বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, ইসরায়েলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্ক সবসময় উন্মুক্ত রয়েছে এবং দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও গোয়েন্দা বিভাগগুলোর মধ্যে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মেই নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান রয়েছে।

 

আবুধাবি এবং তেল আবিবের মধ্যকার এই সহযোগিতামূলক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক যে কোনো একক গুঞ্জন বা অপপ্রচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এবং এটি সামগ্রিক আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে, তা আমিরাতের পক্ষ থেকে বারবার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান অত্যন্ত সংকটময় ও পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সাথে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং তা টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর একটি বিষয়।

 

বিশেষ করে, গাজা উপত্যকা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান ব্যাপক সামরিক উত্তেজনা, সংঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞের এই চরম সময়ে ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের মধ্যকার এই ধরনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বরাবরই বিশ্ববাসীর এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশেষ নজরে থাকে।

 

আকস্মিক এই ধরনের সংবাদ প্রকাশ এবং তার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের পক্ষ থেকে এত দ্রুত ও কঠোর প্রতিবাদ আসার ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করে যে, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সুতা কতটা টানটান এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

 

যেকোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের গোপন কিংবা প্রকাশ্য কূটনৈতিক সফর নিয়ে মনগড়া, যাচাইহীন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ করা হলে তা কেবল দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থার রাজনৈতিক সংকটই তৈরি করে না, বরং পুরো অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও বেশি অস্থিতিশীল ও জটিল করে তুলতে পারে।

 

নেতানিয়াহুর এই কঠোর অবস্থানের ফলে আপাতত এই অপ্রীতিকর ও বিভ্রান্তিকর বিতর্কের অবসান ঘটার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ঠিকই, তবে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির অন্দরে যে নানা ধরনের সংঘাত, গোপনীয় হিসাব-নিকাশ এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে, তা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আরও একবার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

 

- মিডলইস্ট মনিটর