এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি কাঙ্ক্ষিত দাবির আইনি ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলল। কারণ এর আগে অঙ্গরাজ্যটির সরকারি ছুটির কোনো আইনে মুসলমানদের এই দুই উৎসবের পৃথক কোনো স্বীকৃতি ছিল না।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট দলীয় গভর্নর গ্যাভিন নিউজম বহুল আলোচিত ‘স্টেট হলিডেজ: ঈদ’ শীর্ষক অ্যাসেম্বলি বিল বা এবি ২০১৭-এ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেন। এই স্বাক্ষরের মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়ার সরকারি ক্যালেন্ডারে প্রথমবারের মতো মুসলমানদের এই দুই প্রধান উৎসব একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক স্থান লাভ করল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবেই মূল্যায়ন করছে।
এই ঐতিহাসিক বিলটির নেপথ্যের মূল কারিগর ছিলেন সান ফ্রান্সিসকো থেকে নির্বাচিত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অ্যাসেম্বলি সদস্য ম্যাট হ্যানি। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ফলেই বিলটি আলোর মুখ দেখেছে।
নতুন এই আইনি কাঠামোর অধীনে ধর্মীয় দিনগুলোর একটি সুনির্দিষ্ট পরিচয় নির্ধারণ করা হয়েছে। যেহেতু ইংরেজি বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ঈদের কোনো নির্দিষ্ট বা স্থায়ী তারিখ থাকে না, তাই এই আইনে ইসলামি চন্দ্র মাসের হিসাবকে মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
পবিত্র রমজান মাস শেষে শাওয়াল মাসের প্রথম দিনটিকে ঈদুল ফিতর এবং পবিত্র হজ পালনের মাস জিলহজ মাসের দশম দিনটিকে ঈদুল আজহা হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আইনের ব্যাখ্যায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই স্বীকৃতিটি মূলত একটি বেসামরিক বা সরকারি ক্যালেন্ডারভিত্তিক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
রাষ্ট্রীয়ভাবে এই স্বীকৃতির মানে এই নয় যে, কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, আচার বা কর্মকাণ্ডে জোরপূর্বক অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করা হবে। বরং এটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতি রাষ্ট্রের গভীর শ্রদ্ধাবোধের একটি অনন্য নিদর্শন।
তবে এই স্বীকৃতির বাস্তব প্রয়োগ এবং আইনি বাধ্যবাধকতার দিকটি নিয়ে পাস হওয়া আইনে অত্যন্ত স্পষ্ট ও যৌক্তিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনেকেই মনে করতে পারেন যে, সরকারি ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অর্থ হলো ঈদের দিন ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের আওতাধীন সকল সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল, আদালত, স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ থাকবে।
কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়। নতুন পাস হওয়া এই আইন অনুযায়ী অঙ্গরাজ্যের সব প্রতিষ্ঠান বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ রাখার কোনো আইনি নির্দেশ দেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে, আইনে সরকারি ক্যালেন্ডারে ঈদকে সম্মানজনক স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ধর্মপ্রাণ মুসলিম শিক্ষার্থী, বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত সরকারি কর্মী, স্কুল জেলা এবং কমিউনিটি কলেজগুলোর জন্য অত্যন্ত নমনীয় ও সহায়ক কিছু বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত, প্রয়োজন এবং ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করেই এই ছুটির সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। নতুন এই আইনের ফলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে অঙ্গরাজ্যটির বিপুলসংখ্যক মুসলিম শিক্ষার্থী।
পূর্বে ঈদের দিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকা বা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপ কাজ করত। ধর্মীয় উৎসব পালন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-এই দুটির মধ্যে সমন্বয় করা তাদের জন্য বেশ কঠিন একটি বিষয় ছিল।
কিন্তু এখন থেকে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য এক নতুন ও যুগান্তকারী আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো। ঈদের নামাজ আদায় বা পারিবারিক ও ধর্মীয় আনন্দ আয়োজনে অংশগ্রহণ করার জন্য কোনো শিক্ষার্থী যদি তার স্কুলে অনুপস্থিত থাকে, তবে সেটিকে এখন থেকে সম্পূর্ণ আইনিভাবে ‘অনুমোদিত অনুপস্থিতি’ হিসেবে গণ্য করা হবে।
এর ফলে ঈদের দিন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস, টিউটোরিয়াল, চূড়ান্ত পরীক্ষা বা অন্য যেকোনো ধরনের শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অনুপস্থিত থাকলেও শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির মুখে পড়তে হবে না বা তাদের একাডেমিক ফলাফলে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছুটির বিষয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে বিশেষ ক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে এই আইনে। বলা হয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্কুল পরিচালনা পর্ষদের আলোচনার মাধ্যমে ঈদের দিনগুলোতে স্কুল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার বিষয়ে একটি স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে।
যদিও অঙ্গরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে স্কুল বন্ধ রাখা একেবারেই বাধ্যতামূলক করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট স্কুল কর্তৃপক্ষের ঐকমত্যের ওপর বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে। যেসব এলাকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস বেশি, সেসব এলাকার স্কুলগুলো চাইলে নিজস্ব উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে ঈদের দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে পারবে।
একইভাবে ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন কমিউনিটি কলেজগুলোও তাদের স্থানীয় চুক্তির মাধ্যমে এবং নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় ঈদের দিনগুলোতে প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার যৌক্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। এছাড়া, সরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রেও এই দিনগুলোতে ঐচ্ছিক ছুটি কাটানোর একটি আইনি অধিকার সরকারি কাঠামোয় সুচারুভাবে যুক্ত হলো।
এই আইনি বিলটি পাস হওয়ার পেছনের পথপরিক্রমাটি ছিল দীর্ঘ এবং অত্যন্ত ধারাবাহিক। চলতি ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি অ্যাসেম্বলি সদস্য ম্যাট হ্যানি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ‘এবি ২০১৭’ শীর্ষক এই বিলটি আইনসভায় প্রথম উত্থাপন করেন।
বিলটি উত্থাপনের পর ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট অ্যাসেম্বলির বিভিন্ন কমিটিতে এর যৌক্তিকতা, প্রয়োজনীয়তা এবং সামাজিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা এবং বিশ্লেষণ করা হয়। সমস্ত আইনি ধাপ এবং যাচাই-বাছাই শেষে গত ২৬ মে অ্যাসেম্বলিতে বিলটি ভোটাভুটির জন্য তোলা হয়।
সেখানে বিলটি আইনপ্রণেতাদের বিপুল সমর্থন লাভ করে এবং ৬৪-১ ভোটের এক বিশাল ব্যবধানে পাস হয়। এরপর বিলটি উচ্চকক্ষ বা সিনেটের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। সেখানে সিনেটের প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং কিছু ভাষাগত ও আইনি সংশোধনীর পর অ্যাসেম্বলি পুনরায় তাদের সম্মতি প্রদান করে।
সবশেষে গত ১০ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিলটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নরের টেবিলে পাঠানো হয় এবং ২৭ সেপ্টেম্বর গভর্নর গ্যাভিন নিউজম আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করে একে পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত করেন।
এই ঐতিহাসিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সাফল্যের পেছনে কেবল ম্যাট হ্যানি নন, বরং আরও বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল আইনপ্রণেতা এবং সমাজভিত্তিক সংগঠনের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রত্যক্ষ সমর্থন জড়িত ছিল। অ্যাসেম্বলি সদস্য আশ কালরা, স্টেফানি নগুয়েন এবং আইশা ওয়াহাব এই বিলটির অত্যন্ত সক্রিয় সহ-উদ্যোক্তা হিসেবে প্রথম দিন থেকেই কাজ করেছেন।
আইনপ্রণেতাদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও এই আইনি প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে ‘কেয়ার-ক্যালিফোর্নিয়া’, ‘ক্যালিফোর্নিয়া কমিশন অন এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক আইল্যান্ডার আমেরিকান অ্যাফেয়ার্স’ এবং ‘মুসলিম ইমপ্যাক্ট কাউন্সিল’-এর মতো সুপরিচিত সংগঠনগুলো এই বিলটির পক্ষে জনমত গঠনে নিরলসভাবে কাজ করেছে।
তাদের এই সম্মিলিত এবং সুসংগঠিত প্রচেষ্টার ফলেই ক্যালিফোর্নিয়ার আইনসভায় বিলটি এত সহজে ও ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হওয়া সম্ভব হয়েছে। সব মিলিয়ে, ক্যালিফোর্নিয়ার এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সহনশীল, সম্মানজনক এবং মানবিক সমাজ গঠনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে।