সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘প্রকৃত কূটনীতি’ কিংবা ‘ভয়াবহ যুদ্ধ’, উভয় পরিণতির জন্যই তেহরান পুরোপুরি প্রস্তুত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:০৬ পিএম

‘প্রকৃত কূটনীতি’ কিংবা ‘ভয়াবহ যুদ্ধ’, উভয় পরিণতির জন্যই তেহরান পুরোপুরি প্রস্তুত
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রকৃত কূটনীতি কিংবা ভয়াবহ যুদ্ধ-উভয় পরিস্থিতির জন্যই ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্ক সফরে অবস্থানরত ইরানি প্রতিনিধি দলের সদস্য ও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডলে দেওয়া এক অফিসিয়াল বার্তায় এবং পরবর্তীতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই কঠোর ও স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর নীতিমালার আদলে তৈরি এই প্রতিবেদনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হলো। গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বাণীতে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন যে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং তিনি স্বয়ং কোনো নতুন যুদ্ধের বার্তা প্রচারের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্কে আসেননি, বরং তাদের এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ অন্বেষণ করা।

 

তবে একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের অযাচিত আগ্রাসনের মুখে ইরান অতীতেও অবিচল ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বলে জানান তিনি। পরিস্থিতি যদি কোনো কারণে ভয়াবহ যুদ্ধের দিকেও মোড় নেয়, তবে তা মোকাবিলা করার পূর্ণ প্রস্তুতি তেহরানের রয়েছে উল্লেখ করে আরাগচি বলেন যে, এর পাশাপাশি একটি টেকসই ও অর্থবহ কূটনীতির পথও তাদের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত রয়েছে।

 

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম সম্মেলন উপলক্ষে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের ইরানি প্রতিনিধি দল। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে তেহরানের পক্ষ থেকে নতুন একটি শান্তিপ্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

 

তবে প্রখ্যাত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, ইরানের পক্ষ থেকে পাঠানো এই নতুন শান্তি প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে মার্কিন প্রশাসন বাতিল বা নাকচ করে দিয়েছে।

 

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জানান যে, তাঁদের পক্ষ থেকে পেশ করা এই নতুন প্রস্তাবটি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র এখনো দাপ্তরিকভাবে তেহরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি এবং তারা ওয়াশিংটনের সুনির্দিষ্ট দাপ্তরিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছেন।

 

এনবিসির সঙ্গে আলাপকালে আরাগচি নতুন এই চুক্তির রূপরেখা তুলে ধরে জানান, তেহরান এতে সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত বা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। এই শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান আগ্রাসী সামরিক অভিযান চিরতরে বন্ধ করা, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা বা ফ্রিজ করে রাখা ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবিলম্বে অবমুক্ত করা এবং দেশটির তেল রপ্তানি ও বিক্রির ওপর আরোপিত যাবতীয় একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া।

 

আরাগচি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি এই শর্তগুলোতে সম্মত হয় এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে যত দ্রুত সম্ভব কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে ইরান।

 

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁদের প্রস্তাব অত্যন্ত স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। যুক্তরাষ্ট্র যদি কিছু আবশ্যিক ও ন্যায্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে ইরানও হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করতে এক বিন্দুও দ্বিধা করবে না। যেসব শর্তের কথা তেহরান উত্থাপন করেছে, সেগুলোকে নিজেদের জন্মগত ও আন্তর্জাতিক আইনসম্মত অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, ওয়াশিংটন তাদের এই বৈধ অধিকারের প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করবে।

 

তেহরান সব সময়ই শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিদ্যমান পারস্পরিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজে পেতে সচেষ্ট ছিল বলে দাবি করেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বিগত বছরগুলোর ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি এনবিসিকে বলেন, গত ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের সঙ্গে আলোচনার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছিল, তখন তেহরান অত্যন্ত সদিচ্ছার সঙ্গে তা গ্রহণ করেছিল এবং আলোচনা শুরুও হয়েছিল।

 

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, সেই আলোচনার একদম মধ্যবর্তী পর্যায়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বাহিনী ইরানে আকস্মিক সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়াশিংটন পুনরায় আলোচনার প্রস্তাব দিলে ইরান তাতে সাড়া দেয় এবং আবারও আলোচনা শুরু হয়, কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রতিশ্রুতি ও চুক্তি লঙ্ঘন করে বসেন।

 

আলোচনার মাঝপথে বারবার চুক্তি লঙ্ঘিত হওয়ার পরও কূটনীতির টেবিল থেকে ইরান সম্পূর্ণ সরে যায়নি বলে জানান দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো সুবর্ণ সুযোগই তেহরান কোনো অবস্থাতেই হাতছাড়া করতে চায় না।

 

কূটনীতি কখনোই পুরোপুরি ব্যর্থ হতে পারে না এবং কূটনীতির টেবিলে সব সময়ই আশার আলো অবশিষ্ট থাকে। যেকোনো ধরনের ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বা সংকট সুকঠিনভাবে মোকাবিল করার জন্য যেমন দেশের সশস্ত্র বাহিনী ও জনগণ প্রস্তুত রয়েছে, ঠিক তেমনি যেকোনো অর্থবহ ও সম্মানজনক আলোচনার জন্যেও তেহরানের দরজা খোলা রয়েছে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন সৈয়দ আব্বাস আরাগচি। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সমীকরণ বিশ্বজুড়ে এখন গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

- এএফপি, দ্য ন্যাশনাল