আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ বক্তব্যে তিনি অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের কূটনৈতিক সংলাপে বসার ক্ষেত্রে তেহরানের আর আগের মতো ন্যূনতম আস্থাও অবশিষ্ট নেই।
তিনি জানান, অতীতে বিভিন্ন সময়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার ইরানি স্থাপনায় নতুন করে সামরিক হামলা চালানো হয়েছে এবং অন্যায্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের এমন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে তেহরান তাদের ওপর থেকে স্বাভাবিক কূটনৈতিক আস্থা সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলেছে। তবে এই চরম আস্থার সংকট থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে ইরান এখনো যে শান্তিকামী ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ থেকে একেবারেই সরে আসেনি, সে কথাও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
বর্তমান জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবং উভয় দেশের মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের ঘাটতি থাকার কারণে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করছেন বলে ইরানের প্রেসিডেন্ট তথ্য প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, বর্তমানে ভাইপ্রতিম দুই মুসলিম রাষ্ট্র কাতার এবং পাকিস্তান অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করছে। এই দুটি রাষ্ট্র তেহরানের বার্তা ও নীতিগত অবস্থান অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
পেজেশকিয়ান আরও জোর দিয়ে বলেন যে, নতুন করে কোনো জটিল শর্ত আরোপের প্রয়োজন নেই, কারণ উভয় দেশের আলোচনার প্রাথমিক ও মজবুত ভিত্তি হিসেবে পূর্বে দুই পক্ষের সম্মতিতেই স্বাক্ষরিত একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক ইতিমধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে।
এখন ওয়াশিংটনকে অত্যন্ত স্বচ্ছ ও আন্তরিকভাবে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে যে তারা সেই পূর্ববর্তী সমঝোতার শর্তাবলি মেনে চলতে প্রস্তুত রয়েছে কি না। মার্কিন প্রশাসন যদি অতীতে স্বাক্ষরিত সেই ঐতিহাসিক সমঝোতার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়, তবে নতুন করে যেকোনো ধরনের সংলাপ বা আলোচনা কেবল সময়ক্ষেপণে রূপ নেবে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনি হিসেবে পরিচিত অত্যন্ত স্পর্শকাতর হরমুজ প্রণালিতে বিরাজমান সাম্প্রতিক অভূতপূর্ব সংকট প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান শক্তি প্রদর্শনের পরিবর্তে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ তুলে ধরেন যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক জলপথ অবরুদ্ধ হওয়ার মূল ও প্রাথমিক দায় সম্পূর্ণরূপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়।
মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গির কড়া সমালোচনা করে তিনি মন্তব্য করেন যে, ওয়াশিংটন তাদের সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক অবস্থানের মাধ্যমে ইরানের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চলাচলের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিল।
যখন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক পথ সুপরিকল্পিতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে হরমুজ প্রণালির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা তেহরানের জন্য একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক, যৌক্তিক ও সংগত প্রতিক্রিয়া।
তবে এটি কোনো স্থায়ী অনড় অবস্থান নয় উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট করেন যে, যদি ওয়াশিংটন বৈরী নীতি পরিহার করে সমতার ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত সকল বিরোধের ন্যায়সংগত সমাধান করতে সম্মত হয়, তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় অবাধ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
কারণ ইরান বিশ্বাস করে, পেশিশক্তি বা সামরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো টেকসই বিশ্বশান্তি অর্জন করা সম্ভব নয়, বরং সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমেই কেবল সবচেয়ে জটিল সংকটের চিরস্থায়ী সমাধান সম্ভব।
মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক অস্থিতিশীলতা এবং বিশেষ করে ইয়েমেনের চলমান জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমাদের বিভিন্ন অভিযোগের কড়া জবাব দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পরিষ্কার করেন যে, ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে চলা অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার সঙ্গে ইরানের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নীতিগত সম্পৃক্ততা নেই।
সেখানে উদ্ভূত সংকট মূলত ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন এবং প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরবের দ্বিপাক্ষিক বিরোধের ফল। তাই এই দুই পক্ষের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সংকটটি শক্তি প্রয়োগের বদলে নিজেদের মধ্যে প্রত্যক্ষ আলোচনার মাধ্যমেই নিরসন করা উচিত বলে তিনি পরামর্শ প্রদান করেন।
তিনি আরও যোগ করেন যে, দুই পক্ষ যদি আন্তরিকভাবে প্রস্তুত থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার তাগিদে ইরান সেখানে নিরপেক্ষ ও গঠনমূলক সহায়তাকারী ভূমিকা পালন করতে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। এর পাশাপাশি, ইরান অন্যায় ও বৈষম্যের শিকার যেকোনো নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও নৈতিক সংগ্রামের প্রতি সর্বদা সংহতি প্রকাশ করে থাকে।
তেহরানের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শনের কথা উল্লেখ করে পেজেশকিয়ান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, ইরান নীতিগতভাবে কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায় না এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত রক্তপাত সমর্থন করে না।
তিনি আঞ্চলিক ভাতৃত্ববোধকে স্মরণে এনে আবেগপ্রবণ কণ্ঠে ঘোষণা করেন, এক ভাইয়ের বিরুদ্ধে আরেক ভাইয়ের সশস্ত্র লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া কখনোই কোনো সমাধান হতে পারে না, বরং এতে কেবল বহিরাগত আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোই লাভবান হয়।
যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্র ইসরায়েলের অব্যাহত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও একের পর এক সামরিক আগ্রাসনের বিপরীতে ইরানের জাতীয় আত্মমর্যাদা ও প্রতিরোধের ইতিহাস বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান।
তিনি দাবি করেন, বহুপাক্ষিক কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশের নিরীহ জনগণকে জিম্মি করার মাধ্যমে যারা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে পঙ্গু ও দুর্বল করার খায়েশ জেগেছিল, তারা মূলত একটি চরম ভুল ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ করেছে।
তাঁর মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকরা বারবার কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং ইরানের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার ক্ষমতাকে খাটো করে দেখছেন। আগ্রাসী শক্তিগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল কঠোর অবরোধ সৃষ্টি করে ইরানকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা এবং বাধ্য হয়ে তাদের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল করে তোলা।
কিন্তু ইরান তাদের সেই চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দিয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও জাতীয় সক্ষমতার ওপর পূর্ণ বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। পেজেশকিয়ান অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে অভিযোগ করেন যে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে একটি ভয়াবহ বিধ্বংসী যুদ্ধের দাবানলে ঠেলে দিয়েছে।
তারা অত্যন্ত অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে ধারণা করেছিল যে, নজিরবিহীন হামলা ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো ইরানি সরকারের পতন নিশ্চিত হবে। কিন্তু তাঁদের সেই ভ্রান্ত ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে ইরানের জনগণ বহিরাগত হামলার মুখে চরম ঐক্য ও দৃঢ়তা নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও যেকোনো জাতীয় সংকট ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা একইভাবে অটল ও অবিচল থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব সুরক্ষার জন্য এক নতুন কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে বক্তব্য শেষ করেন ইরানের রাষ্ট্রপতি। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, এই স্পর্শকাতর অঞ্চলের শান্তি নিশ্চিত করার জন্য বাইরের কোনো পরাশক্তি বা দূরবর্তী দেশের তথাকথিত নিরাপত্তা রক্ষকের কোনো প্রয়োজন নেই।
বিদেশি শক্তিগুলোর অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপ কেবল এই অঞ্চলের সম্প্রীতি বিনষ্ট করে এবং সার্বিক নিরাপত্তাকে আরও বেশি বিঘ্নিত ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তিনি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির যৌথ প্রয়াসের মাধ্যমেই এই অঞ্চলে একটি টেকসই, স্থায়ী ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলো যদি বাইরের উসকানি এড়িয়ে নিজেদের মধ্যে সমঝোতার সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তবেই মধ্যপ্রাচ্যে সত্যিকারের শান্তি প্রতিষ্ঠা পাবে।
পরিশেষে, বিশ্ব রাজনীতির এই সংকটময় মুহূর্তে ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই ভারসাম্যপূর্ণ বার্তাটি কেবল কূটনীতির প্রতি ইরানের দায়বদ্ধতাকেই পুনর্প্রতিষ্ঠিত করে না, বরং মার্কিন নীতিনির্ধারকদের সামনে নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করার একটি স্পষ্ট সুযোগ এনে দেয়।