বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মার্কিন গণমাধ্যমে ব্যাপক বিশ্লেষণ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইরানের প্রেসিডেন্টের দৃঢ় অবস্থান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইরানের প্রেসিডেন্টের দৃঢ় অবস্থান
ছবি: সংগৃহীত

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই বৈশ্বিক মঞ্চে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজ নিজ দেশের অবস্থান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরছেন।

 

তবে এবারের অধিবেশনে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের দেওয়া একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দৃঢ়চেতা ভাষণ। তার এই ভাষণটি কেবল উপস্থিত বিশ্বনেতাদের মাঝেই নয়, বরং খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলোতেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে, পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্যটি ছিল তেহরানের বিদেশনীতির একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন, যেখানে তারা একদিকে যেমন কূটনীতির পথ খোলা রেখেছে, অন্যদিকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়ার ব্যাপারে অনড় অবস্থান ব্যক্ত করেছে।

 

বিশেষ করে, পশ্চিমা চাপ ও আধিপত্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ না করার যে কঠোর বার্তা তিনি দিয়েছেন, তা মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রধান শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত পত্রিকা 'দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল' জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের দ্বিতীয় দিনে দেওয়া পেজেশকিয়ানের এই ভাষণ নিয়ে একটি বিস্তৃত ও গভীর বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

 

পত্রিকাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানের প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত সুকৌশলে তার বক্তব্যে একটি দ্বৈত বার্তা প্রদান করেছেন। তিনি একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের চলমান উত্তেজনার অবসান ঘটাতে এবং একটি স্থিতিশীল সমাধানে পৌঁছাতে আলোচনার টেবিলে বসার সদিচ্ছা প্রকাশ করেছেন, ঠিক একইভাবে তিনি ওয়াশিংটনকে কঠোর ভাষায় সতর্কও করে দিয়েছেন।

 

পেজেশকিয়ান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তেহরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অন্যায্য চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ বা আধিপত্যবাদী দাদাগিরির কাছে মাথা নত করবে না। একইসঙ্গে, তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে ইরান তার নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি থেকেও সরে আসবে না।

 

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই অবস্থান থেকে এটি পরিষ্কার যে, তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপে আগ্রহী হলেও, নিজেদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং কৌশলগত কর্মসূচির প্রশ্নে কোনো আপস করতে প্রস্তুত নয়।

 

এদিকে, বিশ্বের আরেক স্বনামধন্য ও ঐতিহ্যবাহী মার্কিন দৈনিক 'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস' এই ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি বিরল ও জটিল পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছে। পত্রিকাটির প্রথম পাতার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ইরানই সম্ভবত প্রথম কোনো দেশ, যার রাষ্ট্রপ্রধান এমন এক সময়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সশরীরে অংশ নিচ্ছেন, যখন কিনা আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কার্যত একটি ছায়াযুদ্ধ বা তীব্র বৈরী সম্পর্ক বিরাজ করছে।

 

নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জাতিসংঘের এই উন্মুক্ত ও সর্বজনীন কূটনৈতিক মঞ্চটিকে অত্যন্ত সুকৌশলে এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে অত্যন্ত সাবলীলভাবে ইরানের অবস্থান তুলে ধরেছেন এবং স্পষ্ট করেছেন যে, তার দেশ শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আইনি অধিকার থেকে কখনোই পিছু হটবে না।

 

তবে একই নিঃশ্বাসে তিনি এ-ও জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনীতির দরজাও তারা চিরতরে বন্ধ করে দেননি, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তেহরানের একটি পরিপক্ব ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক ও সংবাদ সম্প্রচার মাধ্যম 'সিএনবিসি' প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই ভাষণটিকে একটি অত্যন্ত সাহসী ও সময়োপযোগী রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

 

সিএনবিসি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জাতিসংঘে দেওয়া এই দৃঢ় ও অবিচল ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরায়েলকে সরাসরি দায়ী করেছেন।

 

তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে পেজেশকিয়ান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধেও তীব্র ও কঠোর সমালোচনা করেন।

 

প্রসঙ্গত, এই ভাষণের মাত্র একদিন আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘে দেওয়া তার এক মন্তব্যে বলেছিলেন যে, প্রায় সাত মাস ধরে চলা এক ভয়াবহ যুদ্ধের পর ইরানকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হবে কি না, তা তিনি বিবেচনা করছেন।

 

ট্রাম্পের এমন সরাসরি হুমকিস্বরূপ বক্তব্যের ঠিক পরপরই পেজেশকিয়ানের এই ভাষণটি ছিল একটি মোক্ষম জবাব। সিএনবিসি আরও জানায়, পেজেশকিয়ান তার ভাষণে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের শিকার হিসেবে উল্লেখ করে দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, তার দেশ যেকোনো অন্যায় ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।

 

মার্কিন সংবাদ মাধ্যম 'এনবিসি নিউজ' তাদের সংবাদ পরিবেশনায় পেজেশকিয়ানের ভাষণের কিছু আবেগঘন ও দৃশ্যমান উপাদানের ওপর বিশেষ আলোকপাত করেছে। এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া হুমকির পর ইরানের প্রেসিডেন্ট তার ভাষণে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেন।

 

তিনি তার বক্তব্যের একপর্যায়ে মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিক্ষিপ্ত একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নির্মমভাবে নিহত শিশুদের ছবি বিশ্বনেতাদের সামনে প্রদর্শন করেন। এই ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি মূলত যুদ্ধ ও আগ্রাসনের কারণে বেসামরিক মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের যে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ও অকাল প্রাণহানি ঘটছে, সেই মর্মান্তিক দিকটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

 

এটি ছিল অধিবেশনে উপস্থিত অনেক বিশ্বনেতার জন্যই একটি বড় ধাক্কা। এছাড়া, এনবিসি নিউজ তাদের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পেজেশকিয়ানের পক্ষ থেকে ইরানের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর ছবি প্রদর্শনের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে তিনি মূলত ইরানের রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি তার অবিচল আনুগত্যের বার্তাই বিশ্ববাসীকে দিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও নীতি নির্ধারণী মহলে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'অ্যাক্সিওস' তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে লিখেছে যে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই কূটনৈতিক মঞ্চটিকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়েছেন।

 

তিনি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে দাঁড়িয়ে সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন-এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষের একটি নীরব ও সরব সংঘাত পূর্ণমাত্রায় অব্যাহত রয়েছে।

 

অ্যাক্সিওসের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পেজেশকিয়ানের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে তেহরান কোনো অবস্থাতেই পশ্চিমা চাপের মুখে পিছু হটবে না, বরং তারা তাদের নিজস্ব শর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে চায়।

 

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ইরানের এই অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গাজা ও লেবাননে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে ইরানের বিভিন্ন মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিয়ত যে উত্তেজনা চলছে, তার সুস্পষ্ট ছায়া পড়েছে জাতিসংঘের এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও।

 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন মূলধারার গণমাধ্যমে পেজেশকিয়ানের ভাষণের এই ব্যাপক প্রচার প্রমাণ করে যে, পশ্চিমা বিশ্ব তেহরানের প্রতিটি পদক্ষেপকে অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট তার ভাষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সফলভাবে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, তার দেশ যুদ্ধের উসকানিদাতা নয়, বরং তারা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগে বদ্ধপরিকর।

 

একইসঙ্গে, পশ্চিমা বিশ্বের যেকোনো অন্যায্য অর্থনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তারা যে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম, সেই বার্তাও তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রদান করেছেন।

 

ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক কূটনীতির বিশ্লেষকরা পেজেশকিয়ানের এই ভাষণটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘের মঞ্চে দেওয়া অন্যতম প্রভাবশালী ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য হিসেবেই আখ্যায়িত করছেন।

 

- পার্সটুডে