তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ফিলিস্তিন সংকটের একটি স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান নিশ্চিত না করে গোটা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলা সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং একটি অলীক কল্পনা মাত্র।
বুধবার জাতিসংঘের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি গাজা উপত্যকায় চলমান নজিরবিহীন মানবিক সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সূত্রমতে, ইরানের প্রেসিডেন্টের এই ভাষণটি ছিল মূলত ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী নৈতিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে একটি জোরালো প্রতিবাদ।
গাজা উপত্যকায় অবরুদ্ধ সাধারণ মানুষের ওপর চলমান ভয়াবহ সামরিক আগ্রাসন ও ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র তুলে ধরে পেজেশকিয়ান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ও চরম ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি ফিলিস্তিন সংকটকে বর্তমান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জাগ্রত বিবেকের ওপর একটি দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী ‘ক্ষত’ হিসেবে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতে, আধুনিক সভ্যতায় গাজা আজ এমন একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে, যা বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চরম অক্ষমতাকেই নির্দেশ করে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ওই অঞ্চলে নারী, শিশু এবং বয়স্ক ব্যক্তিসহ লাখো বেসামরিক মানুষ যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন, তা ঠেকাতে জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর কার্যত কোনো সফলতাই নেই। গাজার এই অমানবিক পরিস্থিতি বিশ্ব মানবাধিকার সনদের চরম লঙ্ঘন এবং মানবতার জন্য এক বিশাল কলঙ্ক বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ এবং জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি গভীর আক্ষেপ ও ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, গত কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন ভূখণ্ডের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এবং নিরাপত্তা পরিষদে একের পর এক অসংখ্য প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।
কিন্তু অত্যন্ত হতাশাজনক বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক এসব প্রস্তাবের কোনোটিই বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি। বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থ এবং সদিচ্ছার অভাবে এসব প্রস্তাব কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
ফলশ্রুতিতে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ দখলদারিত্ব, নির্বিচার সহিংসতা এবং কাঠামোগত মানবাধিকার লঙ্ঘন এখনো অব্যাহত রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছে।
ভাষণের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অংশ জুড়ে ছিল ফিলিস্তিনিদের ‘প্রতিরোধ’ বা রেসিস্ট্যান্স সংগ্রামের যৌক্তিকতার অত্যন্ত তাত্ত্বিক ও বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা। মাসুদ পেজেশকিয়ান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, বিশ্বে যতদিন পর্যন্ত অন্য রাষ্ট্রের ভূমি বেআইনিভাবে জবরদখল, সামরিক আগ্রাসন এবং কাঠামোগত অবিচার টিকে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত নিপীড়িত মানুষের প্রতিরোধ সংগ্রামও অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মেই অব্যাহত থাকবে।
তিনি গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি ও নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আগ্রাসী শক্তিগুলো মনে করে যে তারা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ফিলিস্তিনিদের দমিয়ে রাখতে পারবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, সেখানে অব্যাহত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ও ব্যাপক মাত্রার ধ্বংসযজ্ঞ সাধারণ ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও প্রতিরোধের ওপর বিশ্বাসকে দুর্বল করার পরিবর্তে উল্টো আরও বেশি শক্তিশালী ও ইস্পাতকঠিন করেছে।
সামরিক শক্তি প্রয়োগের অসারতা তুলে ধরে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, নির্বিচার বোমাবর্ষণ, আধুনিক সমরাস্ত্রের ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি অমানবিক অবরোধের মাধ্যমে কোনো স্বাধীনতাকামী জাতির প্রতিরোধ স্পৃহাকে কখনোই চিরতরে ধ্বংস করা যায় না; বরং এটি মানুষের জন্মগত ও স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হিসেবে নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করে।
যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন মানুষ ঘুরে দাঁড়াবেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেকের কাছে একটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও মানবিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, যখন কোনো সাধারণ মানুষকে তার যুগ যুগ ধরে বসবাস করা পৈতৃক ভূমি থেকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে উচ্ছেদ করা হয়, তখন তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? তিনি নিজেই সেই উত্তর দিয়ে বলেন, স্বাভাবিকভাবেই সেই মানুষটি নিজের অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের চূড়ান্ত রূপ তুলে ধরে পেজেশকিয়ান আরও বলেন, একজন নিরীহ মানুষের নিজস্ব বাড়িঘরে যদি রাতের অন্ধকারে অতর্কিতে বোমা হামলা চালানো হয়, তার পরিবার-পরিজনকে যদি চোখের সামনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং তার ওপর যদি অব্যাহতভাবে সামরিক আগ্রাসন ও আক্রমণ চালানো হয়, তাহলেও সে যেকোনো মূল্যে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
কারণ, এটি তার বেঁচে থাকার লড়াই। অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও জোরালো কণ্ঠে তিনি বিশ্বনেতাদের কাছে প্রশ্ন রাখেন, “সবকিছু হারানোর পর এই অসহায় ও নিপীড়িত মানুষগুলোর আর কী করার থাকে?”
তাঁর এই প্রশ্নটি মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সেইসব নেতাদের প্রতি একটি নৈতিক চপেটাঘাত, যারা আগ্রাসনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সমালোচনা করে থাকেন।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বর্তমান দ্বিমুখী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে গাজায় বেসামরিক মানুষের চলমান অবর্ণনীয় দুর্ভোগ এবং এই দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চূড়ান্ত অবসানের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় আহ্বান জানান যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল মৌখিক বিবৃতি বা কাগুজে প্রস্তাব পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং অবিলম্বে এই যুদ্ধ বন্ধে এবং ফিলিস্তিনিদের একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
গাজার এই মানবিক ট্র্যাজেডি বন্ধ করা কেবল একটি রাজনৈতিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি অপরিহার্য নৈতিক দায়বদ্ধতা বলে তিনি বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের মতো একটি বৈশ্বিক মঞ্চে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই ভাষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইরানের দীর্ঘদিনের অবিচল সমর্থনেরই বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি পশ্চিমা দেশগুলোর নীতির প্রতিও একটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ।
তিনি বিশ্ববাসীর সামনে অত্যন্ত সফলভাবে এই বার্তাটি পৌঁছে দিয়েছেন যে, ফিলিস্তিনের মতো একটি জ্বলন্ত সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে বা সামরিক শক্তির ভয় দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বে কখনো টেকসই শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই হতে পারে এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধানের একমাত্র ও চূড়ান্ত পথ।