বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শত্রুর মোকাবিলায় একচুলও পিছু হটবে না ইরান: আইআরজিসির কড়া হুঁশিয়ারি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম

শত্রুর মোকাবিলায় একচুলও পিছু হটবে না ইরান: আইআরজিসির কড়া হুঁশিয়ারি
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক টানাপোড়েনের আবহে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও অটল অবস্থানের কথা বিশ্ব সম্প্রদায়কে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিল ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

 

দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শক্তিশালী সামরিক শাখা 'ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী' বা আইআরজিসি-এর স্থলবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ করমি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ও কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন যে, মাতৃভূমির সুরক্ষায় কোনো ধরনের আগ্রাসনের মুখে তারা বিন্দুমাত্র ছাড় দেবেন না।

 

সম্প্রতি ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন সামরিক অপারেশনাল ঘাঁটি পরিদর্শনকালে তিনি এই কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোর উদ্দেশ্যে দেওয়া এই বার্তায় তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, অতীতের যেকোনো সংঘাতের মতোই আগামী দিনেও ইরানের সামরিক বাহিনী শত্রুর মোকাবিলায় একচুলও পিছু হটবে না।

 

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ করমির এই গুরুত্বপূর্ণ সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক ধরনের চরম সামরিক ও কূটনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকা ঐতিহ্যগতভাবেই কৌশলগত কারণে তেহরানের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

 

এই অঞ্চলে তুরস্ক, ইরাক, আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সীমানা থাকায় জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইআরজিসি সেখানে সব সময়ই সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকে। পাহাড়ি ও দুর্গম এই সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রায়শই বিভিন্ন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, চোরাচালানকারী এবং সন্ত্রাসী চক্র অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে থাকে।

 

এই ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক হুমকি মোকাবিলা করে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বজায় রাখার গুরুদায়িত্ব আইআরজিসির স্থলবাহিনীর ওপর ন্যস্ত। তাই এই অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি ও নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।

 

সামরিক অপারেশনাল ঘাঁটিগুলো পরিদর্শনকালে জেনারেল করমি সেখানে মোতায়েন করা সেনা সদস্যদের সার্বিক যুদ্ধ প্রস্তুতি, লজিস্টিক সক্ষমতা, অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের ব্যবহার এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার নিবিড় মূল্যায়ন করেন।

 

প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দুর্গম পার্বত্য এলাকার কঠিন ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যেও ইরানের সীমান্তরক্ষী ও আইআরজিসির স্থলবাহিনীর সদস্যরা যেভাবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিজেদের পবিত্র দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, তিনি তার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

 

তিনি উপস্থিত শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান করেন এবং যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ, নাশকতা কিংবা আকস্মিক আক্রমণের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব দেওয়ার জন্য বাহিনীকে সর্বদা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে কেবল সমরাস্ত্র নয়, বরং সেনাদের আত্মবিশ্বাস এবং ক্ষিপ্রতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঘাঁটিগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি এই সফরের একটি বিশাল অংশ জুড়ে ছিল আবেগ, আদর্শ এবং ঐতিহ্যের গভীর স্মরণ।

 

জেনারেল করমি ইরানের সমসাময়িক ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী, মর্মান্তিক ও স্মরণীয় অধ্যায়, অর্থাৎ আট বছর স্থায়ী 'পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ'-এর বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান নিবেদন করেন।

 

উল্লেখ্য, ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দাম হোসেনের চাপিয়ে দেওয়া সেই দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে ইরানের লাখ লাখ তরুণ, সাধারণ নাগরিক ও সামরিক সদস্য মাতৃভূমি রক্ষায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

 

আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে সেই সময় আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় একঘরে থাকা ইরানের সাধারণ জনগণ ও নবগঠিত সামরিক বাহিনী যে অসীম সাহসিকতা, অটল দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, তেহরান আজও সেটিকে তাদের জাতীয় ঐক্য, প্রতিরোধ ও সামরিক চেতনার মূল ভিত্তি হিসেবে সগৌরবে বিবেচনা করে।

 

শহীদদের স্মৃতিচারণ করে আইআরজিসির এই বর্ষীয়ান ও শীর্ষ কর্মকর্তা অত্যন্ত আবেগঘন অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, সেই পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের দিনগুলোতে ইরানি জাতি যেভাবে সকল ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শত্রুর আগ্রাসন প্রতিহত করেছিল, বর্তমানের যেকোনো সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সেই একই অটুট মনোবল আজও তাদের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী হাতিয়ার।

 

সেনা সদস্যদের উদ্দেশ্যে দেওয়া তার এই অনুপ্রেরণামূলক ভাষণে জেনারেল করমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, "পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের সময়ের মতোই শত্রুর মোকাবিলায় আমরা একচুলও পিছু হটব না।" তার এই ছোট কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মূলত পশ্চিমা পরাশক্তি এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোর প্রতি একটি সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা দেওয়া হয়েছে।

 

তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক সামরিক জোটের মহড়া কিংবা কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের চাপ যতই বৃদ্ধি পাক না কেন, ইরান তার জাতীয় স্বার্থ, ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে কোনো অবস্থাতেই বিন্দুমাত্র আপস করবে না।

 

তিনি তার বক্তব্যের উপসংহারে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আদর্শিক মন্তব্য করেন। জেনারেল করমি বলেন, "ভবিষ্যৎ ইসলাম ও বীর ইরানি জাতির।" আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমর বিশারদদের মতে, এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বা পেশিশক্তির কথাই বলেননি, বরং একটি আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের সুস্পষ্ট ইঙ্গিতও দিয়েছেন।

 

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইসলামী মূল্যবোধ এবং ইরানি জাতীয়তাবাদকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে একসূত্রে গ্রথিত করা হয়েছে, যা দেশের আপামর জনসাধারণ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে এবং শত্রুর যেকোনো মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে একটি অদৃশ্য ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইআরজিসি কমান্ডারের এই মন্তব্য আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ইরানের সুনির্দিষ্ট সামরিক ও কৌশলগত মতবাদেরই একটি ধারাবাহিক অংশ।

 

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাই নিশ্চিত করে না, বরং দেশের সীমানার বাইরেও তেহরানের কৌশলগত গভীরতা বজায় রাখতে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা করতে প্রধান ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

 

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে-বিশেষ করে ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া এবং ইয়েমেনে-চলমান প্রক্সি সংঘাত এবং পরাশক্তিগুলোর ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির কারণে যে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, সেখানে ইরান নিজেদের একটি অপরাজেয় ও নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর।

 

বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের যে প্রকাশ্য উত্তেজনা এবং প্রচ্ছন্ন ছায়াযুদ্ধ দেখা গেছে, তার প্রেক্ষিতে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের এমন আত্মবিশ্বাসী ও কড়া বক্তব্য দেশের সাধারণ নাগরিক এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মনোবল অভাবনীয়ভাবে চাঙ্গা করতে সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

পরিশেষে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের স্পর্শকাতর সামরিক ঘাঁটিগুলো পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে আইআরজিসির স্থলবাহিনীর কমান্ডার মূলত গোটা বিশ্বকে এই সুনির্দিষ্ট বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, ইরান কখনোই কোনো ধরনের বহিঃশত্রুর হুমকি, সামরিক আস্ফালন বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে নতজানু হবে না।

 

বিগত কয়েক দশকে সামরিক আধুনিকীকরণ, সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নির্ভর করে তেহরান যেকোনো ধরনের আগ্রাসন শক্ত হাতে প্রতিহত করতে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

 

অতীতের আট বছরের পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের মহান আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাথা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের সামরিক বাহিনীও দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় ইস্পাতকঠিন সংকল্পবদ্ধ।

 

বিশ্ব রাজনীতির এই চরম জটিল ও পরিবর্তনশীল সমীকরণে জেনারেল মোহাম্মদ করমির এই বলিষ্ঠ ঘোষণা নিঃসন্দেহে আঞ্চলিক নিরাপত্তার রূপরেখা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে ব্যাপক পর্যালোচনার খোরাক জোগাবে, যা আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে।

 

- পার্সটুডে