গাজা উপত্যকা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান অবর্ণনীয় দুর্ভোগ এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ওপর ক্রমাগত আঘাত আসার মতো চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য কোনোভাবেই আর নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক বিশেষ প্রতিবেদনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় অবস্থানের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি ফিলিস্তিন সংকট থেকে শুরু করে রাশিয়ার বৈশ্বিক নিরাপত্তা হুমকি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাজ্যের সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ রূপরেখা বিশ্বনেতাদের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে গাজা উপত্যকায় চলমান ভয়াবহ সংঘাত এবং এর ফলে সৃষ্ট চরম মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের অভ্যন্তরে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ও নজিরবিহীন হামলার ঘটনা ঘটেছিল, সেটি কোনোভাবেই গাজা উপত্যকা কিংবা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েল সরকারের বর্তমান সীমাহীন সামরিক আগ্রাসন ও ধ্বংসযজ্ঞকে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ করে না।
এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে অসংখ্য নিরীহ শিশু, নারী এবং সাধারণ মানুষ যেভাবে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে তিনি উল্লেখ করেন। বার্নহাম অত্যন্ত আবেগঘন অথচ পেশাদার ভাষায় বিশ্ববিবেকের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেন যে, নিরীহ মানুষের রক্তের বিনিময়ে কোনো রাষ্ট্র নিরাপত্তা অর্জন করতে পারে না।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, গাজার সাধারণ মানুষের এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ব্রিটেন কেবল দূর থেকে তাকিয়ে থাকা কোনো নীরব দর্শক হবে না; বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে এই ভয়াবহ দুর্ভোগের দ্রুত অবসানে কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করবে।
ফিলিস্তিন সংকটের আরেকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দিক, বিশেষ করে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বিষয়েও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ও নীতিগত অবস্থান ব্যক্ত করেন।
তিনি তার ভাষণে আন্তর্জাতিক আইনের প্রসঙ্গ টেনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের এই অব্যাহত দখলদারিত্ব এবং নতুন করে ইহুদি বসতি স্থাপন সম্পূর্ণ বেআইনি ও মানবাধিকারের পরিপন্থী।
পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর ওপর সম্প্রতি যে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, সেটিকে এই দখলদারিত্বের অবৈধতার একটি বড় ও অকাট্য প্রমাণ হিসেবে তিনি অভিহিত করেন।
বার্নহামের মতে, গাজা উপত্যকার পাশাপাশি পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনিদের মৌলিক মানবাধিকার প্রতিনিয়ত চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। অবৈধ বসতি স্থাপনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ভূমি যেভাবে সংকুচিত করা হচ্ছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার সনদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে এই বেআইনি দখলদারিত্ব অবিলম্বে বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক মহলকে আরও কঠোর, ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র এবং সর্বাধিক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পথ হিসেবে পরিচিত দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ওপর সাম্প্রতিক সময়ে যে ধারাবাহিক ও সুপরিকল্পিত আঘাত আসছে, তা নিয়েও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি সতর্ক করে দেন যে, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের এই আইনি ও ঐতিহাসিক অধিকার যদি চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়, তবে এর পরিণাম হবে সমগ্র বিশ্বের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ।
দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান মুখ থুবড়ে পড়ার এই চরম ক্রান্তিলগ্নে বিশ্বনেতারা যদি নির্বিকার নীরবতা পালন করেন, তবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা পুরোপুরি বিনষ্ট হবে বলে তিনি মনে করেন।
বার্নহাম বিশ্বনেতাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, কেবল ফাঁকা বুলি বা প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এখন একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উপযুক্ত সময় এসেছে। একটি স্বাধীন, টেকসই ও ভৌগোলিকভাবে অখণ্ড ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কখনোই স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে তিনি তার জোরালো বক্তব্যে তুলে ধরেন।
ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতির পাশাপাশি সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষার আধুনিকায়নের বিষয়েও জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাজ্যের নতুন কৌশলগত অবস্থানের কথা জানান অ্যান্ডি বার্নহাম। আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তিত যুদ্ধকৌশল এবং সাইবার নিরাপত্তার ক্রমবর্ধমান হুমকির কথা মাথায় রেখে তিনি ঘোষণা করেন যে, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো রক্ষায় যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রতিরক্ষা জোট’ গঠন করা হচ্ছে।
বর্তমান যুগে জাতীয় নিরাপত্তা কেবল প্রথাগত সামরিক অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; বরং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং সাইবার সক্ষমতা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো অত্যাধুনিক ও সংবেদনশীল প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তগুলো যেন কোনোভাবেই অনিশ্চয়তার ওপর ছেড়ে দেওয়া না হয় এবং এই প্রযুক্তির যেন কোনো বিপর্যয়কর অপব্যবহার না ঘটে, সেই লক্ষ্যেই দুই পরাশক্তির মধ্যে এই যুগান্তকারী জোট গঠিত হচ্ছে।
এর ফলে উভয় দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাইবার হামলা, তথ্যযুদ্ধ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত হুমকি মোকাবিলায় আরও বেশি সক্ষম, আধুনিক ও সুসংহত হবে বলে তিনি গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পরিশেষে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে রাশিয়ার কাছ থেকে আসা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
পূর্ব ইউরোপে চলমান অস্থিতিশীলতা এবং রাশিয়ার ক্রমাগত সামরিক আগ্রাসনের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের অবিচল অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, অহেতুক উসকানিমূলক বা আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান থেকে যুক্তরাজ্য সবসময় সচেতনভাবে বিরত থাকবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা নিজেদের জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র উদাসীন। বরং, যেকোনো ধরনের বাহ্যিক সামরিক হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্য তাদের সামরিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ডেটারেন্স জোরদার করার সার্বিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।
বার্নহাম অত্যন্ত সাহসিকতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উদ্ভূত যেকোনো জটিল ও হুমকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য কখনো আতঙ্কিত হবে না; বরং তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত থেকে অত্যন্ত বিচক্ষণতা, ঠান্ডা মাথা ও দৃঢ়তার সঙ্গে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে। তার এই ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী বক্তব্য বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাজ্যের একটি দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করেছে।