মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে চিরতরে বিদায় নিতে হবে: ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম

মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে চিরতরে বিদায় নিতে হবে: ইরান
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের প্রতি এক নজিরবিহীন, তীক্ষ্ণ ও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

 

দেশটির অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সুসজ্জিত সামরিক শাখা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা সংক্ষেপে আইআরজিসি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে জানিয়েছে যে, এই অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে একদিন চিরতরে তাদের পাততাড়ি গুটিয়ে নিতেই হবে।

 

ইরানের জাতীয় বর্ষপঞ্জিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা সপ্তাহ’ উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আইআরজিসি এই অমোঘ সতর্কবার্তা প্রদান করে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিবৃতিটি কেবল একটি সাধারণ সামরিক হুঙ্কার নয়, বরং এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য ও প্রতিরোধমূলক সক্ষমতার এক সুনিপুণ মনস্তাত্ত্বিক মহড়া।

 

আইআরজিসির এই সময়োপযোগী ও অত্যন্ত কঠোর বিবৃতিটি এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এল, যখন গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক থমথমে ও অস্থিতিশীল যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। বিবৃতিতে জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এবং বিশেষ করে ইসলামি বিপ্লবের অকুতোভয় বীর সেনারা সর্বদাই প্রস্তুত রয়েছে।

 

শত্রুর যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা উসকানিমূলক পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক, চূড়ান্ত ও ধ্বংসাত্মক জবাব দেওয়ার জন্য ইরানের সামরিক বাহিনী তাদের সমরাস্ত্র সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রেখেছে। বিবৃতিতে শত্রুপক্ষকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, তাদের সামান্যতম ভুল হিসাব-নিকাশ বা হঠকারী সিদ্ধান্তের পরিণাম যে কতটা ভয়াবহ ও মর্মান্তিক হতে পারে, তা তারা অচিরেই উপলব্ধি করতে পারবে।

 

ইরানের সামরিক বাহিনীর এই সর্বোচ্চ প্রস্তুতি মূলত বহিরাগত শক্তিগুলোর প্রতি এক প্রচ্ছন্ন ও শক্তিশালী বার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। আধুনিক ইরানের শক্তিশালী সামরিক ও সামাজিক ভিত্তি ঠিক কীভাবে এবং কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে, তার একটি বিশদ ও আবেগপূর্ণ বিবরণও এই বিবৃতিতে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

 

আইআরজিসির সর্বোচ্চ কমান্ডের মতে, গত শতকের আট বছর ব্যাপী দীর্ঘ, বিভীষিকাময় ও রক্তক্ষয়ী পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ কেবল একটি সাধারণ সামরিক সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং সেই যুদ্ধটি ছিল গোটা ইরানি জাতির জন্য একটি সামাজিক পুঁজি, অটুট জাতীয় সংহতি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার এক বিশাল ও বাস্তব প্রশিক্ষণক্ষেত্র।

 

সেই চরম সংকটের দিনগুলো ইরানি জাতিকে চিরতরে শিখিয়েছে যে, একটি স্বাধীন দেশের প্রকৃত সামরিক ও রাষ্ট্রীয় শক্তি কেবল বহিরাগত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; বরং এর মূল ও অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি নিহিত রয়েছে দেশের সাধারণ জনগণের সুগভীর বিশ্বাস, অবিচল জাতীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের মধ্যকার ইস্পাতকঠিন পারস্পরিক বন্ধনের ওপর।

 

অতীতের সেই অমূল্য শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে ইরান বর্তমানে নিজেদের জন্য একটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত, আধুনিক ও বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। আইআরজিসির বিবৃতিতে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইরানের বর্তমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল তাদের নিজস্ব ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যেই আর আটকে নেই।

 

বরং এই যুগান্তকারী ব্যবস্থা আজ নিজস্ব জ্ঞান ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার ওপর ভর করে তথ্যপ্রযুক্তি, আন্তর্জাল নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং ভূরাজনৈতিক কৌশলগত নানা ক্ষেত্রেও এক সুবিশাল ও দুর্ভেদ্য প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

 

নিজস্ব মেধা, কৌশলগত উদ্ভাবন এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে অভাবনীয় আত্মনির্ভরতার ওপর ভর করে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী আজ এমন এক অনন্য ও ঈর্ষণীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে তারা যেকোনো ধরনের বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ হুমকিকে একেবারে তার উৎসমুখেই চিরতরে নিষ্ক্রিয় করে দিতে সম্পূর্ণভাবে সক্ষম।

 

সাম্প্রতিক সামরিক অর্জনগুলোর কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করে আইআরজিসি তাদের দীর্ঘ বিবৃতিতে ‘সত্য প্রতিশ্রুতি’ নামক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সামরিক অভিযানগুলোর প্রসঙ্গ টেনে এনেছে।

 

দ্বিতীয় ও তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত এই শ্বাসরুদ্ধকর সামরিক অভিযানগুলোর ব্যাপকতা, নির্ভুলতা ও অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাবের মাধ্যমে ইরানের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত সমগ্র বিশ্ববাসীর সামনে অত্যন্ত সফলভাবে উন্মোচিত হয়েছে।

 

বিবৃতিতে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করা হয়েছে যে, এই সফল অভিযানগুলো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়ি ঘোরানো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদের কথিত সামরিক, প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা শক্তির ভিতকে একেবারে সমূলে নাড়িয়ে দিয়েছে।

 

একইসঙ্গে এই সফল ও সাহসী সামরিক পদক্ষেপগুলো মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধকামী ফ্রন্ট এবং ইরানি জনগণের অনুকূলে গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে পুনর্বিন্যাস করতে একপ্রকার বাধ্য করেছে, যা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এক বিশাল কৌশলগত পরাজয়।

 

সামরিক শক্তির পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য এবং আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের প্রতি গভীর আনুগত্যের বিষয়টিও বিবৃতিতে সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এতে শহীদ ইমাম আয়াতুল্লাহ আল-উজমা ইমাম খামেনায়ীর অসামান্য মর্যাদা ও ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা বিনম্র চিত্তে স্মরণ করে ইরানের সার্বিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সশস্ত্র বাহিনীগুলোর মধ্যকার অতুলনীয় সমন্বয় ও সুদৃঢ় ঐক্যের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

 

আইআরজিসি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় বিশ্ববাসীকে জানিয়েছে যে, ইসলামি বিপ্লবের অকুতোভয় সেনারা, সাহসী স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর নিবেদিতপ্রাণ সদস্যরা এবং শক্তিশালী ও আত্মমর্যাদাশীল একটি স্বাধীন ইরানের জন্য নিজেদের জীবন হাসিমুখে উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত সাধারণ জনগণ আজ একই কাতারে এসে একতাবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

শহীদ নেতার পবিত্র রক্তের চরম প্রতিশোধ নেওয়ার এক অটল ও অনমনীয় প্রত্যয়ে তারা পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি ও সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে প্রহর গুনছে। বিবৃতির একেবারে শেষাংশে এসে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে চূড়ান্ত, কঠোর ও অমোঘ সতর্কবার্তাটি উচ্চারণ করা হয়েছে।

 

আইআরজিসি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে যে, পশ্চিমা পরাশক্তি এবং ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটিকে আজ হোক বা কাল, এই চরম ও নির্মম বাস্তবতা অনুধাবন করতেই হবে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই পুণ্যভূমি থেকে তাদের নিজেদের কথিত অপবিত্র, অবৈধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধমূলক উপস্থিতি চিরতরে সরিয়ে নিতে হবে।

 

বিবৃতিতে অত্যন্ত দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে ও ন্যায়বিচারের অমোঘ বিধানে তারা কোনোভাবেই এই অনিবার্য ঐতিহাসিক পরিণতি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে না। একদিন এই ভূখণ্ড সম্পূর্ণ রূপে বিদেশি শক্তির আগ্রাসনমুক্ত হবে এবং স্থানীয় জনগণ নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করবে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ভূরাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আইআরজিসির এই সুবিস্তৃত ও সময়োপযোগী বিবৃতিটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র নয়, বরং এটি আগামী দিনের সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা।

 

যখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে পরোক্ষ যুদ্ধ এবং প্রত্যক্ষ সংঘাতের মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন ইরানের পক্ষ থেকে এমন একটি শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একইসঙ্গে মিত্রদের প্রতি একটি আশ্বাসের বার্তা এবং শত্রুদের প্রতি একটি চরম মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

 

নিজস্ব সামরিক সক্ষমতায় পরিপূর্ণ আস্থাশীল হয়ে ইরান আজ বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর চোখে চোখ রেখে কথা বলছে। ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক রাজনীতিতে এই বিবৃতির সুদূরপ্রসারী প্রভাব যে দীর্ঘকাল ধরে অনুভূত হবে, তা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও একবাক্যে স্বীকার করছেন।

 

- পার্সটুডে