সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ব্যাপক দরপতন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:১৮ পিএম

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ব্যাপক দরপতন
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘ সময় ধরে চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে এবার বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বস্তিদায়ক খবর উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে।

 

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক পতন ঘটেছে।

 

বাজার বিশ্লেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের দাম গত ১১ দিনের মধ্যে বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সারা বিশ্বের অর্থনীতি এবং সাধারণ ভোক্তাদের জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সূচক বা ব্র্যান্ড-ব্রেন্ট ক্রুড এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)-উভয়ের ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দরপতন লক্ষ করা গেছে। প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে ২ দশমিক ১৬ ডলার পর্যন্ত কমেছে।

 

অন্যদিকে, ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই-এর দাম প্রতি ব্যারেলে ২ দশমিক ১৫ ডলার হ্রাস পেয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল আটটা থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড বিক্রি হয়েছে ১০১ দশমিক ৭১ ডলারে।

 

একই সময়ে প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআই বিক্রি হয়েছে ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে। রয়টার্সের ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, চলতি মাসের ১০ তারিখের পর থেকে এই প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০২ ডলারের নিচে এবং ডব্লিউটিআই-এর দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

 

তেলের বাজারের এই নিম্নমুখী প্রবণতা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। জ্বালানি তেলের দামে এমন আকস্মিক ও বড় ধরনের পতনের পেছনে প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে বিশ্বনেতাদের সম্ভাব্য কূটনৈতিক তৎপরতা।

 

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার যে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। জ্বালানি পণ্যের বাজার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণকারী স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার এ বিষয়ে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

 

তিনি তাঁর বিশ্লেষণে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ কিছুটা হলেও নিম্নমুখী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সপ্তাহে হয়তো কোনো একটি কার্যকর কূটনৈতিক পথ বেরিয়ে আসতে পারে-বিনিয়োগকারীদের এমন জোরালো আশার কারণেই আন্তর্জাতিক তেলের বাজার থেকে ধীরে ধীরে ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ বা ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিজনিত বাড়তি মূল্যের প্রভাব সরে যেতে শুরু করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, এই ধরনের কূটনৈতিক আশা শেষ পর্যন্ত ঠিক কতখানি যৌক্তিক বা বাস্তবসম্মত প্রমাণিত হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহ এবং সময়ই বলে দেবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, নাকি এটি কেবলই একটি সাময়িক বাজার প্রতিক্রিয়া।

 

কূটনৈতিক পর্যায়ে আশার আলো দেখা গেলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এখনো বেশ জটিল এবং সংঘাতপূর্ণ। চলমান এই অচলাবস্থা ও চরম উত্তেজনার মধ্যেই রবিবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের বিরুদ্ধে নতুন করে বেশ কিছু প্রচ্ছন্ন হুমকি ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।

 

তবে এই ধরনের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের মধ্যেও একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সম্ভাবনাময় খবর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি বর্তমান সংকট নিরসনে ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সরাসরি একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসতে গভীরভাবে আগ্রহী।

 

উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের চলতি সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

 

যদি সত্যিই জাতিসংঘের এই বৈশ্বিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্বের শান্তিশৃঙ্খলা ও অর্থনীতির জন্য একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

 

অন্যদিকে, এই সম্ভাব্য কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে ইরানের নিজস্ব কিছু কৌশলগত অবস্থানও কাজ করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজাই বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছেন।

 

তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে ইরান ইতোমধ্যে ফের আলোচনার টেবিলে বসতে সম্মত হয়েছে। তবে এই আলোচনার জন্য ইরান তাদের নিজস্ব কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি ও শর্তাবলী আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেছে।

 

এখন দেখার বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা এই শর্তগুলো নিয়ে কীভাবে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ও টেকসই সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার খবর তেলের বাজারে স্বস্তি আনলেও, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক ও উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে।

 

বিশেষ করে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক কিছু বেপরোয়া ও আগ্রাসী পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। শনিবার হুথি বিদ্রোহীরা আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে যে, তারা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের অত্যন্ত ‘সংবেদনশীল’ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

 

শুধু রাজধানী রিয়াদেই নয়, সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উত্তোলন ও বিপণন কোম্পানি আরামকোর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও তারা বড় ধরনের সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।

 

আরামকোর এই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া স্থাপনাটি লোহিত সাগরের তীরবর্তী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্প শহর ইয়ানবুতে অবস্থিত, যা বিশ্ববাজারে তেল রপ্তানির জন্য সৌদি আরবের একটি অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ত কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

 

হুথি বিদ্রোহীদের এই ধারাবাহিক হামলার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি চরম জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বিভিন্ন ধরনের অবরোধ ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে ইয়ানবু বন্দর থেকেই মূলত বিশ্ববাজারে নিরাপদ পথে তেল সরবরাহ করে আসছিল সৌদি আরব।

 

লোহিত সাগর ব্যবহারের মাধ্যমে তারা হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি এড়ানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক দিন আগে সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হুথি বিদ্রোহীরা অতর্কিত হামলা চালানোর ফলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।

 

পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে রিয়াদ বাধ্য হয়ে ইয়ানবু বন্দর থেকে তাদের নিয়মিত তেলের চালান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে বাধ্য হয়ে তেল রপ্তানির জন্য সৌদি আরবকে আবারও সেই চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের পথেই ফিরে যেতে হয়েছে।

 

বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এই রুট পরিবর্তন অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয় এবং যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাত এই পথটিকে মুহূর্তের মধ্যে অবরুদ্ধ করে দিতে পারে।

 

সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার বর্তমানে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল সুতোর ওপর ঝুলছে। একদিকে যেমন নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সমঝোতার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির সুবাতাস বয়ে আনতে পারে; অন্যদিকে তেমনি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লাগামহীন হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহকারী রুটগুলোর চরম নিরাপত্তাহীনতা সেই স্বস্তিকে যেকোনো মুহূর্তে আবার গভীর সংকটে রূপান্তরিত করতে পারে।

 

বিশ্বের পরাশক্তিগুলো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীর আগ্রহ ও উৎকণ্ঠার সঙ্গে নিউ ইয়র্কের দিকে তাকিয়ে আছে। কূটনৈতিক আলোচনা যদি সফল হয়, তবে তেলের বাজার তার স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি একটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

 

আর যদি এই শান্তি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তবে জ্বালানি তেলের দাম আবারও আকাশচুম্বী হতে পারে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার ওপর। তাই আগামী কয়েকটি দিন আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত নির্ণায়ক হতে চলেছে।

 

- রয়টার্স