রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শত্রুর ওপর অন্ধ আস্থা নেই তবে যেকোনো চুক্তিতে সম্পূর্ণ অবিচল থাকবে ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:২২ পিএম

শত্রুর ওপর অন্ধ আস্থা নেই তবে যেকোনো চুক্তিতে সম্পূর্ণ অবিচল থাকবে ইরান
ছবি: Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে নিজেদের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাষ্ট্রীয় অবস্থানের কথা আবারও পরিষ্কার করেছে ইরান।

 

দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষ বা বৈরী শক্তিগুলোর প্রতি ইরানের কোনো ধরনের অন্ধ বা ভিত্তিহীন আস্থা নেই। তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পাদিত হলে তেহরান তার প্রতিটি শর্ত ও অঙ্গীকারের প্রতি শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ অটল থাকবে।

 

রোববার তেহরানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সমসাময়িক রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। মেহর নিউজ এজেন্সির বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে প্রেসিডেন্টের এই তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেছে।

 

আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধি এবং ইরানের অর্থনীতি ও সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করার নানামুখী অপচেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান। বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল ও সংকটপূর্ণ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ইরান কখনোই যুদ্ধ বা সংঘাতের বিস্তার চায় না।

 

কারণ আধুনিক যুগে যেকোনো ধরনের যুদ্ধ কেবল সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণের জন্যই দুর্ভোগ বয়ে আনে না, বরং সামগ্রিকভাবে গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে।

 

রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থেকেই তেহরান সবসময় উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষে কথা বলে আসছে। তবে একই সঙ্গে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, শান্তিপ্রিয় অবস্থানের অর্থ কোনোভাবেই দুর্বলতা নয়।

 

বাইরের কোনো শক্তির অযাচিত প্রভাব বিস্তার, কৃত্রিম শক্তি প্রদর্শন কিংবা কোনো ধরনের আধিপত্যবাদী দাদাগিরির কাছে ইরানি জাতি অতীতে কখনো নতি স্বীকার করেনি এবং ভবিষ্যতেও কখনো মাথা নত করবে না।

 

কূটনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতার মূল ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার এক গভীর তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইসলামি অনুশাসন ও নৈতিক আদর্শের আলোকে যদি কোনো প্রতিপক্ষ বা শত্রুভাবাপন্ন শক্তি আন্তরিকভাবে শান্তির আহ্বান জানায়, তবে সেই শান্তির প্রস্তাবকে শুরুতেই একপাক্ষিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা সমীচীন নয়।

 

কারণ, একটি গঠনমূলক প্রস্তাবের ভেতরেই হয়তো স্থায়ী নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ মানুষের সুরক্ষার নতুন সুযোগ লুকিয়ে থাকতে পারে। যেকোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের উচিত সংলাপের সেই ইতিবাচক সুযোগগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে সংকটের টেকসই সমাধান খোঁজার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো।

 

তবে এই শান্তিপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে বিন্দুমাত্র শিথিলতা প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নেই বলেও কড়া সতর্কবার্তা দেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে উল্লেখ করেন, শান্তির বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি শত্রুর নেপথ্য ষড়যন্ত্র, গোপন চক্রান্ত ও সুদূরপ্রসারী কৌশল সম্পর্কে সব সময় সর্বোচ্চ মাত্রার সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।

 

কারণ অতীতের বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, শত্রুভাবাপন্ন শক্তিগুলো অনেক সময় আন্তরিক সমঝোতার উদ্দেশ্যে নয়, বরং প্রতিপক্ষের মনোবল ভেঙে দেওয়া কিংবা অপ্রস্তুত অবস্থায় আকস্মিক আঘাত হানার মোক্ষম কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবেও শান্তির ছলচাতুরী ব্যবহার করে থাকে।

 

ফলে আলোচনা ও সমঝোতার টেবিলে বসার ইতিবাচক মানসিকতা প্রদর্শনের পাশাপাশি যেকোনো ধরনের ধোঁকা ও সামরিক আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য আত্মরক্ষা ও জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থার পূর্ণ প্রস্তুতি ধরে রাখাই তেহরানের মূল কৌশল।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য মূলত ইরানের আধুনিক কূটনৈতিক দর্শনের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী বহিঃপ্রকাশ। একদিকে তিনি যেমন সামরিক ঔদ্ধত্য পরিহার করে সংলাপ, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন এবং স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্তাবলি নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলার আইনি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছেন, ঠিক তেমনি অন্যদিকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস না করার দৃঢ় বার্তা দিয়েছেন।

 

বিশ্বের বিভিন্ন শক্তি যখন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো সংঘাত বা মেরুকরণের আশঙ্কা করছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে ইরানের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধানের এই সংযত অথচ স্পষ্ট বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

শক্তি প্রদর্শনের মুখে অনমনীয় থাকা এবং একই সঙ্গে বাস্তবমুখী কূটনীতির পথ উন্মুক্ত রাখার এই নীতি সামনের দিনগুলোতে বৈশ্বিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

- পার্সটুডে