আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাত দিয়ে পার্সটুডে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ খবরটি নিশ্চিত করেছে। সম্প্রতি তুরস্কের কেন্দ্রীয় প্রদেশ কিরশেহিরে আয়োজিত একটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশগ্রহণ করে তিনি এসব কথা বলেন।
মূলত স্থানীয় নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি এবং জনমত-নির্মাতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তুর্কি স্পিকার আঞ্চলিক নিরাপত্তার এই ভয়াবহ চিত্রটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
নুমান কুরতুলমুশ তার দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসন এবং সামরিক হামলার তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাদের সম্প্রসারণবাদী নীতির অংশ হিসেবে কেবল ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরেই নিজেদের সামরিক অভিযান সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তাদের এই আগ্রাসনের কালো থাবা ক্রমান্বয়ে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন এবং কাতারের মতো রাষ্ট্রগুলোকে বিভিন্নভাবে অস্থিতিশীল করার নেপথ্যে ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক বা কৌশলগত হস্তক্ষেপ রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তুর্কি স্পিকার গভীর উদ্বেগের সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর ওপর ইসরায়েলের এই ধারাবাহিক এবং অন্যায্য সামরিক আগ্রাসনের ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল আজ কার্যত এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে, যার উত্তাপ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তেই অনুভূত হচ্ছে।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের বিষয়টিও স্পিকার কুরতুলমুশের এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে এসেছে। তার মতে, ইসরায়েলের মূল উদ্দেশ্য কেবল সামরিক বিজয় অর্জন করা নয়, বরং কৌশলগতভাবে এই অঞ্চলের ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিভেদ ও গভীর অবিশ্বাসের বীজ বপন করা।
মানুষের মধ্যে ধর্মীয়, জাতিগত বা রাজনৈতিক সংঘাতের আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে ফায়দা লোটাই তাদের আসল লক্ষ্য। এই বিভেদের রাজনীতিকে আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য ইসরায়েল এবং তাদের সমমনা আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিগুলো বিভিন্ন চরমপন্থি ও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে নেপথ্যে থেকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে মদদ জোগানোর মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো মূলত নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের পথকেই আরও সুগম করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একটি স্থিতিশীল অঞ্চলকে কীভাবে বিদেশি হস্তক্ষেপে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, এটি তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
এমন এক চরম সংকটময় ও বৈরী পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের করণীয় সম্পর্কেও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তুর্কি পার্লামেন্টের এই শীর্ষ নেতা। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, ইসরায়েলের এই বহুমুখী হুমকি, সামরিক আগ্রাসন এবং সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য এই অঞ্চলের নিপীড়িত ও শান্তিকামী মানুষের হাতে বর্তমানে একটিমাত্র মোক্ষম অস্ত্রই অবশিষ্ট রয়েছে, আর তা হলো- ইস্পাতকঠিন ঐক্য এবং পারস্পরিক সংহতি।
অভ্যন্তরীণ সব ধরনের রাজনৈতিক বা জাতিগত মতানৈক্যকে সম্পূর্ণভাবে দূরে সরিয়ে রেখে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশ ও এর জনগণকে এখন একতাবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ছাড়া কোনোভাবেই এই আগ্রাসী শক্তির নীলকশা নস্যাৎ করা সম্ভব নয় বলে তিনি দৃঢ় মত প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তুর্কি পার্লামেন্ট স্পিকারের এই কঠোর ও সময়োপযোগী বক্তব্য মূলত ফিলিস্তিন ইস্যু এবং মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তার প্রশ্নে তুরস্কের দীর্ঘস্থায়ী ও আপসহীন রাষ্ট্রীয় অবস্থানেরই একটি অত্যন্ত স্পষ্ট প্রতিফলন।
দীর্ঘদিন ধরেই আঙ্কারা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ন্যায়সঙ্গত দাবিকে জোরালোভাবে সমর্থন জানিয়ে আসছে এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসনের তীব্র ও দ্ব্যর্থহীন নিন্দা করে আসছে।
কিরশেহিরের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক থেকে আসা এমন জোরালো বার্তা আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং আরব ও মুসলিম বিশ্বকে নিজেদের মধ্যকার ভেদাভেদ ভুলে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী নৈতিক অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহল গভীরভাবে প্রত্যাশা করছে।