রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মক্কা চুক্তির বাস্তবায়নে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তার প্রস্তাব তুরস্কের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম

মক্কা চুক্তির বাস্তবায়নে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তার প্রস্তাব তুরস্কের
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি নতুন মেরুকরণ এবং কৌশলগত ঐক্যের স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ হামলার পর মিত্র দেশ সৌদি আরবের পাশে অত্যন্ত জোরালোভাবে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক।

 

অতি সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘মক্কা চুক্তি’-এর শর্ত ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সৌদি আরবকে প্রয়োজনীয় সামরিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে আঙ্কারা। এই পদক্ষেপটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত শুক্রবার, যখন সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের অত্যন্ত সুরক্ষিত ও জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু অবকাঠামো লক্ষ্য করে আকস্মিক হামলা চালায় ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীরা।

 

এই ভয়াবহ হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সরেজমিন প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ঠিক কাছাকাছি অবস্থিত আরামকোর একটি সুবিশাল জ্বালানি সংরক্ষণাগারে এই সরাসরি হামলার ঘটনা ঘটে।

 

সেখানে হুথি বিদ্রোহীরা বিস্ফোরকবাহী চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে প্রাথমিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে জানা গেছে। এই সুনির্দিষ্ট সংরক্ষণাগারটিতে মূলত যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী বিমানের জন্য ব্যবহৃত অত্যন্ত দাহ্য বিশেষ জ্বালানি মজুত রাখা হতো।

 

শক্তিশালী বিস্ফোরণের পরপরই ওই এলাকায় দাউ দাউ করে আগুন ধরে যায় এবং বিশাল কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশের দিকে উড়তে দেখা যায়। এই ধোঁয়ার কুণ্ডলী রাজধানী রিয়াদের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে স্পষ্ট দৃশ্যমান ছিল, যা সাধারণ নাগরিকদের মাঝে সাময়িক ভীতির সঞ্চার করে।

 

এমন ভয়াবহ হামলার সরাসরি প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে গিয়ে পড়ে রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বাভাবিক এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমে। যাত্রী ও বিমানের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জরুরি ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

 

এর ফলে রিয়াদের আকাশপথে বিমান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। শত শত পূর্বনির্ধারিত বিমানযাত্রা আকস্মিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয় এবং আরও কয়েকশ বিমানের উড্ডয়ন ও অবতরণ সূচিতে ব্যাপক বিলম্ব ঘটে। ফলশ্রুতিতে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে।

 

হুথি বিদ্রোহীরা পরবর্তীতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতির মাধ্যমে রিয়াদের এই গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো এবং আরামকোর স্থাপনায় হামলার সম্পূর্ণ দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেয়।

 

এমন একটি সংকটজনক ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তুরস্ক। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তার দেশের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়াতে তুরস্ক সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত এবং বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সামরিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে তুরস্ক বিন্দুমাত্র পিছপা হবে না।

 

গতকাল শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) তুরস্কের স্থানীয় ও প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনটিভি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

তিনি বলেন, "আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি যে, সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের ওপর অত্যন্ত গুরুতর ও পরিকল্পিত হামলা চালানো হচ্ছে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর এমন আগ্রাসন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

 

সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত দৃঢ়, সুনির্দিষ্ট এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ একটি চুক্তি রয়েছে। বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের কিছু বিশেষ সামরিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষ করে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সামরিক সক্ষমতার ইস্যুতে।

 

আর মিত্র দেশ হিসেবে তাদের এই প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে আমাদের কোনো ধরনের সমস্যা বা সীমাবদ্ধতা নেই।" তুরস্কের এই দ্রুত ও দৃঢ় প্রতিক্রিয়া মূলত গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক 'মক্কা চুক্তি'-এর একটি প্রত্যক্ষ ও শক্তিশালী ফলাফল। পবিত্র নগরী মক্কায় এক বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের শীর্ষ নেতারা এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছিলেন।

 

এই চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে- এই তিন মিত্র দেশের যেকোনো এক দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর যদি কোনো বহিরাগত বা সশস্ত্র হামলা চালানো হয়, তবে তা সম্মিলিতভাবে তিনটি দেশের ওপরই সরাসরি হামলা হিসেবে কঠোরভাবে বিবেচিত হবে।

 

আন্তর্জাতিক সামরিক চুক্তির আদর্শে তৈরি করা এই যুগান্তকারী চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে পারস্পরিক সুরক্ষার একটি নতুন বলয় তৈরি করেছে। হুথি বিদ্রোহীদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার পর তুরস্ক যেভাবে মক্কা চুক্তির শর্ত স্মরণ করিয়ে দিয়ে সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য সামরিক সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে, তা প্রমাণ করে যে এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি কেবল কোনো কাগুজে চুক্তি নয়।

 

বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং মিত্রদের প্রতি পারস্পরিক নির্ভরতার এক নতুন ও বাস্তবমুখী যুগের সূচনা করেছে এই চুক্তি। রিয়াদে হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই তুরস্কের এই বলিষ্ঠ অবস্থান আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা মিত্রদের জন্য আশ্বাসের এবং হামলাকারীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট কূটনৈতিক ও সামরিক বার্তা হিসেবে কাজ করছে।