বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান তীব্র উত্তেজনার মাঝে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিশ্ব সম্প্রদায়কে সতর্ক করে ঘোষণা করেছেন যে, এই সংবেদনশীল অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বা নিরাপত্তা রক্ষায় বাইরের কোনো পরাশক্তির অযাচিত সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কখনোই মেনে নেওয়া হবে না।
শনিবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আয়োজিত ‘বিশ্ব সংলাপ ফোরাম’-এ অংশ নিয়ে তিনি এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও নীতিগত মন্তব্য করেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতির ক্ষেত্রে তার এই জোরালো বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা বহন করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
শনিবার ‘বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনের আহ্বান: উন্নয়নকে অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা, মানবিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং অস্থির বিশ্বে ন্যায়বিচার পুনর্গঠন’ শীর্ষক এক বিশেষ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
নিজের সারগর্ভ ও বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্যে আব্বাস আরাকচি মধ্যপ্রাচ্যের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলের সামগ্রিক সুরক্ষার রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত ও গঠনমূলক আলোচনা করেন।
তিনি বিগত কয়েক দশকের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিদেশি শক্তির ধারাবাহিক হস্তক্ষেপ, অযৌক্তিক সামরিক চাপ এবং অবিরাম যুদ্ধ পরিস্থিতি একটি অনস্বীকার্য ও রূঢ় সত্যকে বিশ্বের সামনে অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রমাণ করেছে।
আর তা হলো, সামরিক হস্তক্ষেপ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই নিরাপত্তা সৃষ্টি করতে পারে না এবং রাজনৈতিক চাপ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কোনো অঞ্চলে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এর পরিবর্তে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ও বৈধ হাতিয়ার হিসেবে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে, যার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও স্থায়ী বিরোধের এক অন্তহীন ধ্বংসাত্মক ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সামরিক শক্তির যথেচ্ছ ও বেপরোয়া ব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি। তিনি বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অশুভ ধারা তৈরি হয়েছে।
সামরিক শক্তিকে এখন আর সংকট সমাধানের সর্বশেষ উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে না; বরং এটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে পরাশক্তিগুলোর নিজেদের সুবিধামতো নতুনভাবে সাজানোর একটি স্থায়ী ও আগ্রাসী ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
এই আধিপত্যবাদী কাঠামোর মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদিবাদী ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক আগ্রাসনকে মূল্যায়ন করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ইরানের শীর্ষ এই কূটনীতিক অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেন যে, তার দেশের বিরুদ্ধে চালানো এই আক্রমণ ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ, আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং একটি নগ্ন আগ্রাসী যুদ্ধ, যার পেছনে আগে থেকে কোনো ধরনের যৌক্তিক উসকানি বা গ্রহণযোগ্য কারণ ছিল না।
বর্তমান বিশ্বের অত্যন্ত জটিল, মেরুকরণকৃত ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার অপরিহার্যতার ওপরও ব্যাপকভাবে আলোকপাত করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান পৃথিবীতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রকৃত, কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত বহুপাক্ষিকতার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। বৈশ্বিক পরিবর্তনের বর্তমান নেতিবাচক গতিপথ পরিবর্তন করতে হলে বিশ্বনেতাদের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অসীম সাহসের প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, বিশ্বকে এখন ধ্বংসাত্মক সামরিকতাবাদ থেকে সরে এসে মানুষের জীবনমান ও টেকসই উন্নয়নের দিকে, অযাচিত হস্তক্ষেপবাদ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি নিঃশর্ত সম্মানের দিকে, সম্মিলিত শাস্তির অমানবিক প্রথা থেকে নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার দিকে, বেছে বেছে জবাবদিহি করার পরিবর্তে সর্বজনীন ন্যায়বিচারের দিকে এবং অবিরাম যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে টেকসই ও স্থায়ী শান্তির দিকে ধাবিত হতে হবে।
এই রূপান্তর ছাড়া বিশ্ব কখনোই নিরাপদ হতে পারে না। বক্তব্যের একেবারে শেষাংশে এসে আব্বাস আরাকচি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, পশ্চিম এশিয়ায় বা মধ্যপ্রাচ্যে কোনো বিদেশি শক্তি কখনোই টেকসই ও স্থায়ী নিরাপত্তা চাপিয়ে দিতে পারে না।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রকৃত মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে এই অঞ্চলের দেশগুলোর নিজস্ব অধিকার ও অপরিহার্য দায়িত্ব হওয়া উচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই অঞ্চলের প্রতিটি স্বাধীন দেশের নিজেদের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অভিন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলাখুলি ও স্বাধীনভাবে আলোচনার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে।
বিদেশি শক্তির যেকোনো ধরনের সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটের সমাধান নিজেদের সম্মিলিত প্রজ্ঞার মাধ্যমেই খুঁজে বের করতে হবে, তবেই কেবল এই সংঘাতময় অঞ্চলে প্রকৃত ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব।