শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মক্কায় ড্রোন হামলার অভিযোগ নিয়ে বিশ্বকে সতর্ক থাকার আহ্বান ইরানের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম

মক্কায় ড্রোন হামলার অভিযোগ নিয়ে বিশ্বকে সতর্ক থাকার আহ্বান ইরানের
ছবি : File Photo

পবিত্র নগরী মক্কাকে লক্ষ্য করে ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীদের ড্রোন হামলার যে গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগ সৌদি আরব উত্থাপন করেছে, সে বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পরাশক্তি ইরান।

 

গত বুধবার সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগ তোলার পরপরই সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া, ক্ষোভ এবং গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। ধর্মীয় আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাতের এই খবরে যখন পরিস্থিতি উত্তপ্ত, ঠিক তখনই তেহরান সংযম প্রদর্শনের বার্তা দিয়েছে।

 

এই উত্তেজনাকর ও জটিল পরিস্থিতিতে কোনো সুনির্দিষ্ট পক্ষকে তাড়াহুড়ো করে অভিযুক্ত করার আগে পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গভীরভাবে এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছে ইরান সরকার।

 

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ধরনের অপরীক্ষিত অভিযোগ সমগ্র অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত বিবৃতিতে তাঁর দেশের কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, মুসলিম বিশ্বের পবিত্র স্থানসমূহ-বিশেষ করে মক্কা, পবিত্র মদিনা শহর এবং জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের পবিত্রতা ও সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষা করা যেকোনো মুসলমানের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

 

এসব পবিত্র স্থানে আগত পুণ্যার্থী, ধর্মপ্রাণ দর্শনার্থী এবং এর আশেপাশের বেসামরিক বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা সামরিক হুমকির অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে ইরান। তবে একই সঙ্গে তিনি একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক সতর্কবার্তাও উচ্চারণ করেছেন।

 

তাঁর যৌক্তিক দাবি হলো, পবিত্র মক্কার দিকে ধেয়ে আসা কোনো ড্রোন আকাশপথে প্রতিহত করার দাবি করলেই তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রকে তার জন্য এককভাবে দায়ী করা আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থী।

 

এর পেছনে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো পক্ষের উসকানি, ইন্ধন বা গভীর ষড়যন্ত্র থাকতে পারে, যা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা অসম্ভব। বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই শীর্ষ মুখপাত্র আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী একটি আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন।

 

তিনি বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলটি দীর্ঘকাল ধরে বহুবিধ আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং মিথ্যা প্রচারণার শিকার হয়ে আসছে। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক পরিসরে এমন অসংখ্য ভিত্তিহীন তথ্য ও গুজব ছড়ানো হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল এই অঞ্চলে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংঘটিত বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপরাধ থেকে সাধারণ মানুষের মনোযোগ অত্যন্ত সুকৌশলে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া।

 

এ ধরনের ভিত্তিহীন, উসকানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের মাধ্যমে ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ ও দীর্ঘস্থায়ী বিভেদ সৃষ্টির এক গভীর চক্রান্ত চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

 

তাই সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে যেকোনো সংবাদের সত্যতা যাচাইয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, ইয়েমেনের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী হুথি বিদ্রোহীরাও তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এই গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে একে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

 

ইরান-সমর্থিত এই শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতা আব্দুল মালিক আল-হুথি সৌদি আরবের সঙ্গে চলমান সাম্প্রতিক দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব ও সামরিক সংঘাত নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, হুথিদের বিরুদ্ধে পবিত্র নগরী মক্কায় ড্রোন হামলা চালানোর যে চেষ্টার কথা পশ্চিমা ও সৌদি গণমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং একটি গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগান্ডা।

 

তাঁর জোরালো অভিযোগ, সৌদি আরব অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান মক্কা নগরীকে নিজেদের একটি 'যুদ্ধের ঢাল' বা কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার হীন চেষ্টা করছে।

 

এর মাধ্যমে রিয়াদ মূলত ধর্মীয় অনুভূতির সুযোগ নিয়ে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সহানুভূতি আদায় করে অন্যান্য ইসলামিক দেশগুলোকে ইয়েমেনের ওপর নতুন করে আগ্রাসন চালাতে প্রলুব্ধ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।

 

হুথি নেতা আব্দুল মালিক আল-হুথি তাঁর বিবৃতিতে ইয়েমেনের সাধারণ, নিরপরাধ ও দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ থাকা নির্যাতিত জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের জন্য সরাসরি সৌদি আরবের আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী নীতিকে দায়ী করেন।

 

তিনি বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীন মুসলিম দেশকে সৌদি আরবের এই ধর্মীয় প্রলোভনে পা না দেওয়ার এবং ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল তথ্যও উপস্থাপন করেন।

 

হুথি নেতার দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে সৌদি আরবের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুই শতাধিক অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সেনা সদস্য অবস্থান করছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, ইয়েমেনে হুথিদের নিয়ন্ত্রিত বেসামরিক অঞ্চলগুলোতে সৌদি আরব যে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী বিমান হামলাগুলো পরিচালনা করছে, তার প্রায় সবগুলোরই লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, রাডার সমন্বয় এবং সার্বিক কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করছে এই মার্কিন সেনারাই।

 

ফলে এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধকে কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এর পেছনে পশ্চিমা পরাশক্তির সরাসরি সামরিক ইন্ধন ও অংশগ্রহণ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। সব মিলিয়ে পবিত্র মক্কা নগরীকে ঘিরে ড্রোন হামলার এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মুসলিম বিশ্ব এখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে, কারণ পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনো ধরনের সংঘাত পুরো বিশ্বেই সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে সক্ষম।