বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হুথি আক্রমণ মোকাবিলায় সৌদি আরবকে মার্কিন গোয়েন্দা ও কৌশলগত সহায়তা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫১ এএম

হুথি আক্রমণ মোকাবিলায় সৌদি আরবকে মার্কিন গোয়েন্দা ও কৌশলগত সহায়তা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবারও নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক এবং ক্রমবর্ধমান আক্রমণের মুখে নিজেদের দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরবকে রক্ষায় এগিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র।

 

সৌদি সামরিক বাহিনীকে নিরবচ্ছিন্ন গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ এবং কৌশলগত সামরিক পরিকল্পনায় সার্বিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে একটি বিশেষ মার্কিন সামরিক টাস্কফোর্স। বৃহস্পতিবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদটি নিশ্চিত করেছে।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত অবস্থান ওই অঞ্চলে সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম আঞ্চলিক যেকোনো নিরাপত্তা হুমকি ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের অন্যতম প্রধান অংশীদার সৌদি আরবের সঙ্গে একটি সুদৃঢ় ও মজবুত নিরাপত্তা জোট বজায় রেখে চলেছে।

 

সংশ্লিষ্ট ওই মার্কিন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, সেই দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের লক্ষ্যেই উভয় দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্যের নির্বিঘ্ন আদান-প্রদান এবং কৌশলগত সামরিক পরিকল্পনা আরও সুসংহত করার উদ্দেশ্যে এই বিশেষ টাস্কফোর্সটি স্থাপন করা হয়েছে।

 

এর ফলে সৌদি আরবের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি যেকোনো আকস্মিক হামলা আগে থেকেই নিখুঁতভাবে প্রতিহত করার সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেন পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে।

 

বিশেষ করে গত জুলাই মাসে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ নতুন করে তীব্র রূপ ধারণ করার পর থেকে হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয়। এর পরপরই লোহিত সাগরে চলাচলকারী সৌদি আরবের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজের ওপর তাদের আক্রমণের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়।

 

গত সপ্তাহে হুথি যোদ্ধারা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল এবং অত্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই প্রণালিটির গুরুত্ব অপরিসীম।

 

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কোনো কারণে অবরুদ্ধ বা অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে বাব আল-মানদেব প্রণালিকে আন্তর্জাতিক পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ এবং গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প সমুদ্রপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 

এই সংঘাত কেবল সামরিক খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি জ্বালানি খাতের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারগুলোকে মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে একের পর এক ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা।

 

বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখা এখন সৌদি আরবের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হুথিদের এই ধারাবাহিক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের কড়া জবাব দিতে সৌদি আরবও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।

 

হুথি গোষ্ঠীর নিজস্ব সূত্র থেকেই জানানো হয়েছে যে, সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী ইয়েমেনের অভ্যন্তরে হুথিদের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক মাত্রায় প্রতিশোধমূলক বিমান হামলা চালিয়েছে।

 

এই চলমান সংঘাতের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ নিয়ে নানামুখী কূটনৈতিক তৎপরতা ও আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, হুথি বিদ্রোহীরা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ করে তাদেরকে এই আঞ্চলিক সংঘাতের মাঝে কোনো ধরনের সামরিক বা কৌশলগত হস্তক্ষেপ না করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে।

 

এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, হুথিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং তারা সংঘাতের পরিধি আরও বাড়াতে চাইছে না। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শিকড় মূলত অনেক গভীরে প্রোথিত।

 

২০১৪ সালের শেষের দিকে হুথি বিদ্রোহীরা যখন ইয়েমেনের রাজধানী সানা পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়, মূলত তখন থেকেই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সূত্রপাত ঘটে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈধ সরকারের পক্ষে একটি শক্তিশালী সামরিক জোট গঠন করে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব।

 

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের আরেক পরাশক্তি ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হুথি বিদ্রোহীদের উন্নত মানের অস্ত্র, শক্তিশালী ড্রোন এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছে বলে আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে।

 

তবে বর্তমান সময়ের এই ভয়াবহ যুদ্ধে এবং সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে নিজেদের কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা থাকার কথা ইরান সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। পরিশেষে বলা যায়, ইয়েমেন সংকটের কোনো দ্রুত বা সহজ সমাধান এই মুহূর্তে দৃশ্যমান নয়।

 

মানবিক বিপর্যয় এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের এই জটিল সমীকরণে মার্কিন গোয়েন্দা সহায়তার ফলে সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযানকে কীভাবে ঢেলে সাজায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।

 

এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য এখন পুরো বিশ্ব গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই চলমান দ্বন্দ্বের একটি শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানালেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে।

 

- গালফ নিউজ