বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬
১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মক্কায় ড্রোন হামলার অপচেষ্টাকে ‘কালো অধ্যায়’ আখ্যা দিলেন সৌদি আরব

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:০৬ পিএম

মক্কায় ড্রোন হামলার অপচেষ্টাকে ‘কালো অধ্যায়’ আখ্যা দিলেন সৌদি আরব
ছবি : Collected

ইসলাম ধর্মের পবিত্রতম স্থান মক্কার সন্নিকটে ড্রোন হামলার যে অপচেষ্টা চালানো হয়েছে, তাকে একটি ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির সরকার ও সামরিক জোটের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে যে, বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত হানার হীন উদ্দেশ্যেই এই পরিকল্পিত উসকানি ও ঘৃণ্য সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানো হয়েছে।

 

একই সঙ্গে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র হুতি গোষ্ঠীর এহেন ধৃষ্টতার সমুচিত জবাব দিতে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় ও কঠোরতম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুস্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে রিয়াদ।

 

বুধবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর প্রকাশিত এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পবিত্র মক্কা নগরীর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সুরক্ষিত এলাকায় এ ধরনের হামলার প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট বাহিনীর মুখপাত্র তুর্কি আল মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ও কড়া বার্তায় এই হামলার চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানান।

 

তিনি তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, এই চরম শত্রুতাপূর্ণ ও ঘৃণ্য প্রচেষ্টা উগ্রবাদী সন্ত্রাসী বাহিনী হুতি মিলিশিয়াদের ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক আইন ও নীতি লঙ্ঘনের দীর্ঘ তালিকায় নিঃসন্দেহে আরও একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিরকাল চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

 

এটি নিছক কোনো সাধারণ সামরিক আক্রমণ নয়, বরং এটি সমগ্র বিশ্বের লাখো-কোটি মুসলমানের পবিত্রতম অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত ও জঘন্য কর্মকাণ্ড।

 

পাশাপাশি তিনি হুতিদের এই বেপরোয়া সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন, যা থেকে এটি সম্পূর্ণ প্রতীয়মান হয় যে সৌদি আরব এই ঘটনাকে জাতীয় ও ধর্মীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

 

এদিকে, পবিত্র নগরী মক্কায় হামলার এই ন্যাক্কারজনক অপচেষ্টার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। ৫৭টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক জোট অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি) এই ঘটনার কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছে।

 

জোটটির পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে, এ ধরনের হামলার চেষ্টা কেবল পবিত্র ধর্মীয় স্থান ও মসজিদের পবিত্রতা এবং মর্যাদাই চরমভাবে লঙ্ঘন করে না, বরং এটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিরীহ বেসামরিক মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক ও ভীতি তৈরির একটি জঘন্য অপপ্রয়াস।

 

আন্তর্জাতিক রীতিনীতি তোয়াক্কা না করে পবিত্র স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার এই প্রবণতা আঞ্চলিক শান্তির জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে মনে করছে সংস্থাটি। মক্কার কাছে এই ড্রোন ভূপাতিত করার চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি এমন এক উদ্বেগজনক সময়ে ঘটল, যখন ইয়েমেন এবং সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাত নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করেছে।

 

চলতি সপ্তাহের শুরুতেই সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল শহর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা চালানোর গুরুতর অভিযোগ রিয়াদের পক্ষ থেকে হুতিদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।

 

সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হুতিদের ছোড়া এসব ধ্বংসাত্মক হামলায় খামিস মুশাইত, আভা এবং তায়েফ শহরে অন্তত ১৩ জন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। বেসামরিক এলাকায় এ ধরনের আক্রমণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

এর আগে, গত রোববার, ১৩ই সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের একটি সামরিক ঘাঁটিতে সরাসরি হামলার দায়ও অত্যন্ত দাম্ভিকতার সঙ্গে স্বীকার করে নিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। তবে এই সংঘাতের ময়দানে দুপক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছে।

 

পাল্টা অভিযোগ হিসেবে হুতি গোষ্ঠীর দাবি, গত শনিবার এবং মঙ্গলবার ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন এলাকায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী দফায় দফায় ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলা ও অভিযোগের ফলে ইয়েমেন ও সৌদি সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে এক চরম যুদ্ধাবস্থা ও মানবিক সংকট বিরাজ করছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতা ও আগ্রাসন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করতে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার পরিধিও অত্যন্ত সুকৌশলে বাড়িয়ে চলেছে।

 

গত সপ্তাহেই ইয়েমেনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর উপকূলের একটি কৌশলগত বন্দরনগরী এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য নৌপথের কাছাকাছি অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।

 

হুতিদের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক বিস্তার ও আগ্রাসী পদক্ষেপ কেবল সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য এক বিশাল হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

- সিএনএন