মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টিকাদানে বিশ্বে প্রথম এবং বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় তৃতীয় অবস্থান অর্জনে ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম

টিকাদানে বিশ্বে প্রথম এবং বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় তৃতীয় অবস্থান অর্জনে ইরান
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরান। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন, আধুনিকীকরণ এবং সাধারণ মানুষের জন্য জনস্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশটির ধারাবাহিক অগ্রগতি বিশ্বমঞ্চে সম্পূর্ণ নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

 

সম্প্রতি ইরানের শীর্ষ চিকিৎসা কর্তৃপক্ষের এক আনুষ্ঠানিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় জানানো হয়েছে যে, দেশব্যাপী পরিচালিত ব্যাপকভিত্তিক জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় এর সুফল পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে দেশটি বর্তমানে বিশ্বে প্রথম স্থানে অবস্থান করছে।

 

একই সঙ্গে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল, ব্যয়বহুল ও স্পর্শকাতর শাখা হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসাতেও বৈশ্বিক তালিকায় তারা তৃতীয় শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসার মতো অভাবনীয় গৌরব অর্জন করেছে।

 

ইরানের চিকিৎসা খাতের এই যুগান্তকারী সাফল্যের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন দেশটির চিকিৎসা পরিষদের (মেডিকেল কাউন্সিল) প্রধান ডক্টর মোহাম্মদ রাইসজাদেহ।

 

শুধু চিকিৎসায় নয়, জনসংখ্যার অনুপাতে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ চিকিৎসকের প্রাপ্যতার দিক থেকেও ইরান বর্তমান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে অনেকাংশেই ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ইয়াং জার্নালিস্টস ক্লাবের একটি বিস্তারিত ও তথ্যবহুল প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বর্তমান সময়ে ইরানে প্রায় এক লাখ সত্তর হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত, উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ চিকিৎসক অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নিয়মিতভাবে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।

 

চিকিৎসা খাতের এই বিশাল পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশটিতে বর্তমানে প্রতি দশ হাজার সাধারণ নাগরিকের বিপরীতে চিকিৎসকের আনুপাতিক সংখ্যা হলো উনিশ জন। অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের সর্বোচ্চ সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক পরিসংখ্যান ও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, সুস্থ ও স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিশ্বে প্রতি দশ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসকের গড় সংখ্যা হলো ষোলো জন।

 

সেই আন্তর্জাতিক গড়ের তুলনায় ইরানের এই বর্তমান অবস্থান শুধু সন্তোষজনকই নয়, বরং এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি অনুকরণীয় আদর্শ মডেল। স্বাস্থ্যখাতে মানবসম্পদের এই ব্যাপক উন্নয়ন নিশ্চিতভাবেই দেশটির শক্তিশালী চিকিৎসা অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যনীতির এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

 

ইরানের চিকিৎসা পরিষদের প্রধান ডক্টর রাইসজাদেহ তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে টিকাদান কর্মসূচি এবং বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণে ইরানের অভূতপূর্ব অর্জনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করেছেন।

 

তিনি স্পষ্টভাবে জানান, সংক্রামক নানা ধরনের রোগ প্রতিরোধ এবং সার্বিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইরানের টিকাদান কর্মসূচির আওতা, ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োগের কার্যকারিতা এতটাই নিখুঁত ও সুশৃঙ্খল যে, তা বর্তমানে বিশ্বের অন্য যেকোনো উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে।

 

অন্যদিকে, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও গভীর স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে বিবেচিত বন্ধ্যাত্ব বা সন্তানহীনতা দূরীকরণেও ইরানি চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা আধুনিক প্রযুক্তি ও নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার মাধ্যমে অসামান্য ও ঈর্ষণীয় দক্ষতা অর্জন করেছেন।

 

অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, উন্নত গবেষণাগার এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিরলস ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ সফল দেশের অসামান্য মর্যাদা লাভ করেছে ইরান, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিকিৎসা পর্যটনের ক্ষেত্রেও দেশটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে।

 

কেবলমাত্র সাধারণ চিকিৎসা বা রোগ নির্ণয়েই নয়, বরং মানবদেহের অত্যন্ত জটিল, সূক্ষ্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রেও ইরান চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিজেদের বৈশ্বিক শ্রেষ্ঠত্ব অত্যন্ত সফলভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।

 

ডক্টর মোহাম্মদ রাইসজাদেহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে অবহিত করেন যে, মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অঙ্গ যকৃৎ এবং বৃক্ক প্রতিস্থাপনের মতো অত্যন্ত সূক্ষ্ম শল্যচিকিৎসায় ইরান বর্তমানে পুরো বিশ্বে চতুর্থ স্থান অধিকার করে আছে।

 

অঙ্গ প্রতিস্থাপন চিকিৎসায় এ ধরনের ঈর্ষণীয় ও শীর্ষস্থানীয় অবস্থান প্রমাণ করে যে, ইরানের হাসপাতালগুলোর ভৌত অবকাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শল্যচিকিৎসকদের পেশাদারি দক্ষতা সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক মানের সমকক্ষ।

 

এর পাশাপাশি জন্মগতভাবে কিংবা পরবর্তী সময়ে দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার কারণে শ্রবণশক্তি হারানো রোগীদের জন্য অত্যাধুনিক শ্রবণযন্ত্র প্রতিস্থাপনেও তারা অভাবনীয় ও যুগান্তকারী সাফল্য পেয়েছে।

 

হৃদরোগের উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসা, হৃদ্‌যন্ত্রের অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচার এবং স্নায়ুতন্ত্রসহ অন্যান্য নানাবিধ জটিল সার্জারির ক্ষেত্রেও ইরান আজ বিশ্বের প্রথম সারির ও উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে সমান্তরালভাবে সগৌরবে অবস্থান করছে।

 

সামগ্রিক এই সকল প্রেক্ষাপট ও তথ্য-উপাত্তের আলোকে বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ইরানের এই বহুমুখী ও অভাবনীয় সাফল্য কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

 

বরং এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদী সুপরিকল্পিত ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যনীতি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় সরকারের নিরবচ্ছিন্ন ও বিপুল বিনিয়োগ এবং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির এক সুমিষ্ট সুফল।

 

আন্তর্জাতিক নানামুখী চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ ও ভূরাজনৈতিক নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণায় এমন অভাবনীয় উৎকর্ষ সাধন করে ইরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক, শক্তিশালী ও প্রেরণাদায়ী বার্তা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য মানচিত্রে নিজেদের এই গৌরবান্বিত অবস্থান ধরে রাখতে এবং স্বাস্থ্যসেবাকে প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে আরও আধুনিকায়ন করতে দেশটির চিকিৎসা ও গবেষণা খাত আগামী দিনগুলোতেও তাদের এই নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা অত্যন্ত দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

 

- পার্সটুডে