মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভয়াবহ আক্রমণের মুখেও অবিচল ইরানি জনগণ, অটুট ঐক্যই জাতীয় প্রতিরক্ষার মূলভিত্তি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৩১ পিএম

ভয়াবহ আক্রমণের মুখেও অবিচল ইরানি জনগণ, অটুট ঐক্যই জাতীয় প্রতিরক্ষার মূলভিত্তি
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এবং দেশের ওপর চলমান বহুমুখী সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে ইরানের জনগণের অদম্য সাহস, দেশপ্রেম ও ইস্পাতকঠিন ঐক্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন দেশটির জাতীয় সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও দেশবাসীর উদ্দেশে উল্লেখ করেছেন যে, বিদেশি শত্রুরা তাদের লাগাতার ও ভয়াবহ সামরিক হামলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ভয় ও আতঙ্কের বীজ বপন করতে চেয়েছিল।

 

তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মনস্তাত্ত্বিক চাপের মাধ্যমে গোটা জাতিকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। কিন্তু ইরানের আপামর জনসাধারণ অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে রাজপথে নিজেদের সরব উপস্থিতির মাধ্যমে সেই ঘৃণ্য অপচেষ্টাকে সম্পূর্ণভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছে।

 

জনগণের এই অবিচল অবস্থান সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে তাদের অটুট প্রতিরোধ, গভীর আত্মমর্যাদাবোধ এবং অনবদ্য জাতীয় গৌরবের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মঙ্গলবার দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ও আনুষ্ঠানিক বার্তায় সংসদ স্পিকার এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন।

 

তাঁর এই দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ইরানের ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া তথাকথিত ‘তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধ’ বা বহুমুখী সংঘাতে ঠিক দুই শত দিন অতিক্রান্ত হয়েছে।

 

দীর্ঘ এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষের অবিস্মরণীয় ভূমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, গত দুই শত দিন ধরে ইরানের আপামর জনসাধারণ অত্যন্ত দায়িত্বশীলতা, গভীর দেশপ্রেম ও প্রখর রাজনৈতিক সচেতনতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত রাজপথে উপস্থিত থেকে বিশ্ববাসীকে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ বার্তা দিয়েছে।

 

আর তা হলো, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর শক্তির সবচেয়ে বড় এবং মজবুত ভিত্তি হলো এই দেশের সাধারণ জনগণ। তাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও নিরবচ্ছিন্ন অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, কোনো বাহ্যিক অপশক্তি বা সামরিক আগ্রাসন তাদের জাতীয়তাবোধ ও মনোবলকে এত সহজে পরাস্ত করতে পারবে না।

 

শত্রুদের সামরিক ও কৌশলগত চরম ব্যর্থতার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে মোহাম্মদ বাকের কলিবফ বলেন, বিরোধী শক্তিগুলোর একটি মজ্জাগত ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, উপর্যুপরি সামরিক হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমাবর্ষণের মাধ্যমে তারা খুব সহজেই ইরানি জনগণের ইস্পাতকঠিন মনোবল এবং স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছাশক্তিকে চিরতরে ভেঙে দিতে সক্ষম হবে।

 

কিন্তু চলমান এই গভীর সংকটের ঠিক দুই শততম রজনীতে এসে রাজপথে স্বাধীনতাকামী জনতার বাঁধভাঙা উপস্থিতি আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর সেই পুরনো হিসাবনিকাশকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে।

 

হামলাকারীদের সেই অহংকার ও ভ্রান্ত ধারণা আজ রাজপথের বাস্তবতায় চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়েছে, কিন্তু শত প্রতিকূলতার মাঝেও ইরানের জনগণের দৃঢ়তা ও সংকল্প একটুও টলেনি। বরং প্রতিটি ভয়াবহ হামলার পর তারা যেন মাতৃভূমি রক্ষায় আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়ে রাজপথে নেমে এসেছে।

 

দেশের জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সংযোগের বিষয়টি অত্যন্ত সাবলীলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ইরানের এই শীর্ষ আইনপ্রণেতা। তিনি বলেন, আজ রণক্ষেত্রে বা যুদ্ধের ময়দানে যে শক্তিশালী, আধুনিক ও দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানকে বহিঃশত্রুর বহুমুখী আক্রমণ থেকে প্রতিনিয়ত রক্ষা করে চলেছে, তার প্রকৃত শেকড় লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের অগাধ ঈমান এবং দেশের প্রতি তাদের শর্তহীন দৃঢ় সংকল্পের গভীরে।

 

দেশের রাজপথে সাধারণ নাগরিকদের এই অবিচল ও নির্ভীক উপস্থিতি কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ময়দানেও ইরানকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

 

জনগণের এই নিরঙ্কুশ ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের কারণেই আজ রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা বৈশ্বিক দরবারে জাতীয় মর্যাদা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে মাথা উঁচু করে যেকোনো বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অসীম শক্তি লাভ করছেন।

 

একই সঙ্গে জনগণের এই নিশ্ছিদ্র জাতীয় ঐক্য ইরানকে ভেতর থেকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও দুর্বল করার জন্য শত্রুদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দিচ্ছে।

 

ইরানের জনগণের অতুলনীয় ত্যাগ, সাহস ও সহনশীলতার কথা অত্যন্ত বিনম্র চিত্তে স্মরণ করে স্পিকার আরও বলেন, বিগত দিনগুলোতে দেশের সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের ভয়াবহ আগুন, তীব্র নিরাপত্তাজনিত মানসিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাজনিত অভাবনীয় মাত্রার অর্থনৈতিক সংকটের মতো অত্যন্ত কঠিন ও দুঃসহ সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

 

এত সব ভয়ানক প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তারা এক মুহূর্তের জন্যও রাজপথ থেকে সরে যায়নি বা নিজেদের আদর্শিক অবস্থান থেকে এক পা-ও পিছু হটেনি। দেশি-বিদেশি শত্রুরা যখন আকাশ থেকে বোমাবর্ষণের মাধ্যমে জনমনে মৃত্যুভয় সৃষ্টি করে গোটা জাতিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল, ঠিক তখনই বীর জনগণ তাদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির মাধ্যমে প্রতিরোধ, আত্মমর্যাদা ও জাতীয় গৌরবের এক অকল্পনীয় শক্তির মহড়া প্রদর্শন করেছে।

 

এই অভূতপূর্ব গণজাগরণ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায্য অর্থনৈতিক অবরোধ, সামরিক যুদ্ধ কিংবা দেশের অভ্যন্তরীণ যেকোনো ছোটখাটো রাজনৈতিক মতপার্থক্য কোনোভাবেই প্রায় নয় কোটি ইরানি নাগরিকের সঙ্গে তাদের জাতীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের যে গভীর ও আত্মিক বন্ধন রয়েছে, তাকে বিন্দুমাত্র দুর্বল করতে বা ছিন্ন করতে পারেনি।

 

বক্তব্যের শেষাংশে সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান সময়ের এই অবিস্মরণীয় ত্যাগ ও তিতিক্ষা কখনোই ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাবে না।

 

বরং বিশ্ব ইতিহাস অনন্তকাল ধরে ইরানের আপামর সাধারণ জনগণকে তাদের মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই সবচেয়ে গৌরবময়, বীরত্বপূর্ণ ও আত্মত্যাগের প্রতিরোধের অধ্যায়গুলোর সঙ্গে অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

 

- পার্সটুডে