সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬
৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধ শেষেও ইরানে থাকতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, জ্বালানি তেল নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত ট্রাম্পের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম

যুদ্ধ শেষেও ইরানে থাকতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, জ্বালানি তেল নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত ট্রাম্পের
ছবি : Collected

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত শেষ হওয়ার পরও দেশটিতে মার্কিন সামরিক ও কৌশলগত উপস্থিতি বজায় রাখা এবং সেখানকার তেল সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আয়ারল্যান্ড সফরকালে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি এই ইঙ্গিত প্রদান করেন।

 

একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলতি বছরের মধ্যেই শেষ হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে ভূরাজনৈতিক বিতর্ক ও তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

বিশেষ করে একটি সার্বভৌম দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বৈশ্বিক বিশ্লেষকেরা।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, যুদ্ধ অবসানের পর ইরান থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার না করে সেখানে অবস্থান বজায় রাখা এবং দেশটির জ্বালানি তেল মজুত ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ করেননি ট্রাম্প।

 

আয়ারল্যান্ডে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেওয়া এবং একটি গলফ টুর্নামেন্ট উপভোগের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি তাঁর এই পরিকল্পনার কথা জানান। বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ইতি ঘটতে পারে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে এলে তার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে। যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্রই যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রল ও অন্যান্য জ্বালানির মূল্য দ্রুত হ্রাস পাবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

নিজের এই সম্ভাব্য কৌশলের ন্যায্যতা তুলে ধরতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির উদাহরণ সামনে আনেন। উল্লেখ্য, লাতিন আমেরিকার ওই দেশটির বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।

 

ট্রাম্পের দাবি, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ অর্থনৈতিক রাজস্ব লাভ করেছে, তা যুদ্ধের যাবতীয় ব্যয়ভার কয়েক গুণ মিটিয়ে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়তো ইরান ত্যাগ করা, তবে ভেনেজুয়েলার মতো সেখানেও থেকে গিয়ে জ্বালানি তেলের নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করবে।

 

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক ওঠানামা এবং সামগ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির পটভূমিতে ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার পর বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ব্যবসায়ী ও পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন, এই হামলার প্রভাবে সোমবার থেকে অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য আবারও বৃদ্ধি পেতে পারে। এ ধরনের অস্থিরতার সময়ে শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

 

কূটনৈতিক সমঝোতার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, তিনি কোনো সাধারণ বা দুর্বল চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী নন; বরং কেবল একটি ‘সঠিক এবং ফলপ্রসূ চুক্তি’ হলেই ওয়াশিংটন তা গ্রহণ করবে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে।

 

যদিও ট্রাম্পের এই দাবি শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে তেহরান। অতীতেও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে, কোনো প্রকার অন্যায্য চাপ বা হুমকির মুখে তারা সমঝোতার টেবিলে বসবে না।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের এই অবস্থানকে দ্বিমুখী কৌশল হিসেবে মূল্যায়ন করছেন। একদিকে যুদ্ধ সমাপ্তির ইঙ্গিত দিয়ে নিজ দেশের ভোটারদের স্বস্তি দেওয়া, অন্যদিকে তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের বার্তা দেওয়া।

 

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা বয়ে আনবে, নাকি অঞ্চলটিকে আরও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মাঝে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে।

 

রয়টার্স