শনিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় কোনো মার্কিন পাহারাদারের প্রয়োজন নেই, ইরানের প্রেসিডেন্ট

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় কোনো মার্কিন পাহারাদারের প্রয়োজন নেই, ইরানের প্রেসিডেন্ট
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা, শান্তি এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মতো কোনো বহিরাগত পরাশক্তির ‘আঞ্চলিক পাহারাদার’ হিসেবে কাজ করার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই বলে বিশ্বমঞ্চে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে চলমান প্রত্যক্ষ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে বিরাজমান চরম উত্তেজনার মধ্যেই তিনি এই অত্যন্ত দৃঢ় ও তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই ক্রান্তিলগ্নে তার এই বক্তব্যকে মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলমান অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতার ফাঁকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন ইরানের প্রেসিডেন্ট।

 

বিশ্বনেতাদের সেই জমায়েতেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যের নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে তার দেশের এই অনমনীয় অবস্থানের কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন। উক্ত বৈঠকের পর ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর উদ্দেশ্যে প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়।

 

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে এই অঞ্চলের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা কেবল এর ভৌগোলিক সীমারেখার ভেতরের মূল অংশীদার এবং এখানকার স্থানীয় দেশগুলোই পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে পারে।

 

বহিরাগত কোনো শক্তির অযাচিত সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এই অঞ্চলের জন্য কখনোই কল্যাণকর হতে পারে না, বরং তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান এই ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক অভাবনীয় যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মর্মান্তিকভাবে নিহত হন।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর থেকেই গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুদ্ধের ভয়াল দাবানল অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর তাৎক্ষণিক ও কঠোর প্রতিক্রিয়ায় পুরো অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থের ওপর তীব্র মাত্রায় পাল্টা সামরিক হামলা শুরু করে তেহরান।

 

সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কৌশলগত এক মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয় ইরান। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই জলপথটির গুরুত্ব এতটাই অপরিসীম যে, গোটা বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কেবল এই একটি মাত্র সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়েই প্রতিদিন পরিবাহিত হয়ে থাকে।

 

সেই সংঘাতের পর থেকেই এই অতি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথটির নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কবজায় নিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক অবিরাম, ধ্বংসাত্মক এবং রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে। এই প্রলয়ংকরী যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের যেকোনো দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারত।

 

কিন্তু বর্তমানের এই চরম যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান এই সামুদ্রিক পথে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন ও কঠোর নিয়ম আরোপ করেছে। এখন থেকে বিদেশি যেকোনো জাহাজকে এই পথ অতিক্রম করতে হলে তেহরানের পূর্বানুমতি গ্রহণ করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

 

এমনকি ভবিষ্যতে এই প্রণালি ব্যবহারের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের সামুদ্রিক মাশুল বা ফি আদায় করারও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ইরানের নীতিনির্ধারকরা। যেসব বাণিজ্যিক বা সামরিক জাহাজ ইরানের এই নতুন আইনি ও নৌ নির্দেশ অমান্য করার চেষ্টা করছে, তাদের ওপর নিয়মিতভাবে ইরানের নৌবাহিনী ও উপকূলীয় রক্ষীরা সামরিক হামলা চালাচ্ছে।

 

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে ইরানের এই একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও অবরোধ ভেঙে দিতে এবং জলপথটি পুনরায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করতে দেশটির উপকূলীয় সামরিক ও বেসামরিক এলাকাগুলোতে পর্যায়ক্রমে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী।

 

মধ্যপ্রাচ্যের এই ধ্বংসাত্মক ও সর্বব্যাপী যুদ্ধ ইতোমধ্যে দীর্ঘ ছয় মাস পেরিয়ে গেছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির এই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অবরোধের অত্যন্ত মারাত্মক ও প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারের ওপর।

 

সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার কারণে চলমান এই সপ্তাহেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি একশ ডলারের সর্বোচ্চ গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে, যা গোটা বিশ্বের উদীয়মান ও উন্নত অর্থনীতির জন্যই এক ভয়াবহ অশনিসংকেত।

 

তবে এতসব ধ্বংসযজ্ঞ, বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যাপক প্রাণহানির পরও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সংঘাতের পথ পরিহার করে শান্তির পক্ষেই তার সুর কিছুটা নরম করেছেন।

 

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করার প্রয়াস নিয়ে বলেছেন, তাদের ওপর গত কয়েক মাস ধরে নানামুখী অন্যায়, অবিচার ও সামরিক আগ্রাসন চাপিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তারা আর নতুন করে কোনো যুদ্ধ কিংবা চলমান এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দীর্ঘসূত্রতা কামনা করেন না। বরং সব পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে এই মুহূর্তে একটি সম্মানজনক ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই তাদের রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্র নীতির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

 

- এএফপি