ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলো সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য দেশকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তোলার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির জটিল পরিমণ্ডলে শত্রুপক্ষের সঙ্গে এমন কোনো অবস্থান থেকে ইরান কখনোই কোনো ধরনের আপস বা আলোচনা করবে না, যা দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য অসম্মানজনক, মর্যাদাহানিকর বা চরম দুর্বলতার পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
ইরানের নির্ভরযোগ্য স্থানীয় সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ-এর দেওয়া তথ্যমতে, সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় ও স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য, গবেষক এবং প্রধানদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ ও নজিরবিহীন মতবিনিময় সভায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এসব সময়োপযোগী মন্তব্য করেন।
ওই বৈঠকে তিনি দেশের যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংকট ও আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় জাতীয় সহনশীলতা এবং নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির উদাত্ত আহ্বান জানান। প্রেসিডেন্ট গভীরভাবে মনে করেন, দেশের সার্বিক উন্নয়নে ও আধুনিকায়নে বিদ্যাপীঠগুলোর অপরিসীম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তাই অর্থনীতি, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা, নিজস্ব সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, সাহিত্য চর্চা এবং অন্যান্য সকল বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও গবেষণাধর্মী ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের মাধ্যমেই কেবল একটি দেশ তার ভেতরের ও বাইরের সব ধরনের চ্যালেঞ্জ শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে পারে বলে তিনি দৃঢ় মত প্রকাশ করেন। এই তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা সভায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা ও দায়িত্ব নিয়েও বিশদভাবে কথা বলেন।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের তরুণ শিক্ষার্থী, যাদের অনেকেই আধুনিক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী এবং পরিবর্তনকামী, তাদের মেধা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় অঙ্গীভূত করার ওপর তিনি সর্বোচ্চ জোর দেন।
তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের উচিত এই তরুণ সমাজকে যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং তাদের তারুণ্যের শক্তিকে গঠনমূলক কাজে লাগানো। তিনি বলেন, তরুণদের জন্য এমন একটি অবাধ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে তারা কেবল রাজপথের প্রতিবাদ বা ক্ষোভ প্রকাশের চক্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মেধাভিত্তিক চর্চার মাধ্যমে দেশের নানাবিধ কাঠামোগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা সমাধানে নিজেদের সক্রিয়ভাবে নিয়োজিত করবে।
দেশের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি হিসেবে তরুণদের এই ইতিবাচক অংশগ্রহণ অদূর ভবিষ্যতে ইরানের জাতীয় অগ্রগতিকে আরও বহুগুণ ত্বরান্বিত করবে বলে তিনি প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জাতীয় ঐক্যের যে সুদৃঢ় বার্তা তিনি ধারাবাহিকভাবে দিয়ে আসছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধানদের সঙ্গে হওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেও তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে।
মাসুদ পেজেশকিয়ান অত্যন্ত জোরালোভাবে ও খোলামেলা ভাষায় উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিকভাবে দেশের কোনো নাগরিকের প্রতি তার কোনো ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত বা আদর্শিক বিদ্বেষ নেই। দেশের পাহাড়সম সমস্যা সমাধানে দলমত নির্বিশেষে সকল পেশা ও শ্রেণির মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা গ্রহণে তিনি সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছেন।
তিনি বলেন, দেশের বৃহত্তর কল্যাণে যিনিই নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসবেন এবং জাতীয় সংকট উত্তরণে গঠনমূলক সহায়তা করবেন, তার রাজনৈতিক বা আদর্শিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, বর্তমান সরকার তা অত্যন্ত সাদরে ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করবে।
এটি মূলত একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতি তার প্রশাসনের অবিচল প্রতিশ্রুতিরই এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। নিজের রাজনৈতিক দর্শনের সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, তিনি কোনো ধরনের চরমপন্থায় মোটেও বিশ্বাসী নন।
বামপন্থী বা ডানপন্থী, কট্টর ধর্মীয় বা সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ-সমাজের কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা মতাদর্শের সঙ্গেই তার প্রশাসনের কোনো সংঘাত বা অভ্যন্তরীণ বিরোধ নেই। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, একটি আধুনিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কোনো সরাসরি সংঘাত থাকা উচিত নয়।
বরং মতের ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের মাঝে এক সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলাই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রধান হাতিয়ার হওয়া উচিত। পরিশেষে, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ইরানের ভঙ্গুর ও সংবেদনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন।
দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতির কারণে দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনীতি যে প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, দেশের বর্তমান চরম অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গিয়ে কিংবা অবহেলা করে যদি কোনো কাল্পনিক বা অপরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে তা সাধারণ জনগণের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।
বাস্তবতাবিবর্জিত ও হঠকারী যেকোনো অর্থনৈতিক নীতি সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে দেশের জন্য আরও ভয়াবহ নেতিবাচক ফল ও দীর্ঘমেয়াদি অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বা সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের প্রকৃত অবস্থা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক মানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন।