বুধবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা অসম্ভব: বিপ্লবী গার্ড বাহিনী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:২৬ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা অসম্ভব: বিপ্লবী গার্ড বাহিনী
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত কৌশলগত জলসীমায় এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে সামরিক উপস্থিতি ও আধিপত্য বজায় রাখা আর কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছে ইরান।

 

দেশটির প্রভাবশালী সামরিক শাখা ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ঊর্ধ্বতন মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি সম্প্রতি এই চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে হরমুজ প্রণালি বর্তমানে একটি অন্যতম প্রধান প্রভাবক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

আর ইরান তার ভৌগোলিক সুবিধা, আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলের ওপর নিজেদের কার্যকর, নিরঙ্কুশ ও অপ্রতিরোধ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের বর্তমান যে সামরিক কর্তৃত্ব ও নিরবচ্ছিন্ন নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা কেবল কোনো ফাঁকা বুলি নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত এবং মাঠে প্রমাণযোগ্য বাস্তব সত্য।

 

আধুনিক রাডার ব্যবস্থা এবং নজরদারি প্রযুক্তির মাধ্যমে শত্রুপক্ষের যেকোনো ধরনের সামরিক সরঞ্জাম, যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোযান অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে শনাক্ত করা, সেগুলোর গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার ক্ষেত্রে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান সক্ষমতা বিশ্ববাসীর সামনে দেশটির উদীয়মান কৌশলগত সামরিক শক্তির একটি বড় প্রমাণ হিসেবেই প্রতিফলিত হচ্ছে।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি এখন আর কেবল সাধারণ কোনো সমুদ্রপথের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সমগ্র বৈশ্বিক ব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের যেকোনো সম্ভাব্য যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণকারী অন্যতম প্রধান সমীকরণে পরিণত হয়েছে।

 

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে জেনারেল মোহেব্বি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলে সামরিক সংঘাত ও উত্তেজনা বৃদ্ধির আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশটি সুসজ্জিত যুদ্ধজাহাজ পারস্য উপসাগরে নিয়মিত টহল দিত।

 

কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সেই দম্ভ ও একচেটিয়া আধিপত্য আর চোখে পড়ছে না। ইরানের উন্নত সামরিক প্রযুক্তির ভয়ে বর্তমানে দেশটির অধিকাংশ যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী রণতরি ইরানের উপকূল থেকে পিছু হটে শত শত কিলোমিটার দূরে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছে।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি নতুন প্রজন্মের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান এখন অনেক দূরবর্তী অবস্থান থেকেও শত্রুর যেকোনো সামরিক সরঞ্জামকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার অভাবনীয় সক্ষমতা অর্জন করেছে।

 

আর ইরানের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতাই মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর সামরিক অভিযান পরিচালনার ব্যয় ও ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির দিকটি উল্লেখ করে আইআরজিসির এই মুখপাত্র দাবি করেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের সামরিক সরঞ্জাম ও জনবলের তীব্র ক্ষয়ক্ষতির একটি চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি যে কেবল যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস বা সামরিক সরঞ্জাম বিকল হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে এমন একটি বৈরী ও চরম উত্তেজনাকর অঞ্চলে অবস্থান করার ফলে মার্কিন নৌসেনাদের মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার ওপর এর এক সুদূরপ্রসারী ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

 

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, সমুদ্রের বুকে এমন বিশাল পরিসরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা এবং বছরের পর বছর নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখার জন্য বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক সরঞ্জাম, নিরবচ্ছিন্ন রসদ এবং আনুষঙ্গিক সহায়তার প্রয়োজন হয়।

 

ফলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত রাখা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত-উভয় দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমেই কঠিন ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হচ্ছে।

 

বিদ্যমান পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির পক্ষেও দীর্ঘ সময় ধরে এত বিপুল পরিমাণ সামরিক ব্যয় এবং অব্যাহত ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

 

শুধু হরমুজ প্রণালি নয়, নিজেদের সামুদ্রিক সীমানার বাইরেও ইরানের সমুদ্রপথ ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের পরিধি সম্প্রসারিত হওয়ার বিষয়টিও এই সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। জেনারেল মোহেব্বি জানান, আগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থাপনার জন্য নির্ধারিত এলাকাটি শুধুমাত্র হরমুজ প্রণালির একটি নির্দিষ্ট চৌহদ্দির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

 

কিন্তু বর্তমানে ইরান তাদের এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পরিধি আরও অনেক বেশি বিস্তৃত করেছে। এই নতুন ও বিস্তৃত এলাকার একটি বড় অংশ ইরানের চাবাহার বন্দর এলাকা থেকে শুরু হয়ে ওমান সাগর এবং আরব সাগরের বিশাল সমুদ্রপথকেও নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করেছে।

 

অদূর ভবিষ্যতে এই সম্প্রসারিত সামুদ্রিক অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নতুন নীতিমালা ও নির্দেশনার বিস্তারিত তথ্য যথাসময়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

 

সম্ভাব্য যেকোনো সামুদ্রিক অবরোধ এবং তা মোকাবিলার কৌশল সম্পর্কেও ইরানের এই সামরিক মুখপাত্র অত্যন্ত খোলামেলা ও কড়া বার্তা প্রদান করেন। তিনি জানান, কোনো সমুদ্র অবরোধ এখন আর শুধু একটি প্রণালি বা নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি প্রয়োজনে পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং আরব সাগরের এক বিশাল ও বিস্তৃত এলাকাজুড়ে অত্যন্ত কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হতে পারে।

 

পশ্চিমা বিশ্বের এ ধরনের যেকোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ, উসকানি ও অবরোধের হুমকি অত্যন্ত কঠোরভাবে মোকাবিলা করার জন্য ইরান ইতিমধ্যেই বহুমুখী সামরিক কৌশল ও সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে রেখেছে।

 

পরিশেষে জেনারেল মোহেব্বি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইরান তার সশস্ত্র বাহিনীর নিজস্ব সক্ষমতা এবং কৌশলগত সামরিক শক্তির ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে। কোনো বিদেশি শক্তি বা শত্রুকে অযৌক্তিক চাপ, ভিত্তিহীন হুমকি বা সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই অঞ্চলে তাদের হীন লক্ষ্য অর্জনের বিন্দুমাত্র সুযোগ তেহরান কখনো দেবে না এবং যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরান সব সময় উপযুক্ত, তাৎক্ষণিক ও চরম ধ্বংসাত্মক জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

 

- পার্সটুডে