বুধবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মার্কিন ডুবো ড্রোন আটক

আইআরজিসির অভাবনীয় সাফল্যকে ‘নকআউট’ আখ্যা স্পিকারের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম

আইআরজিসির অভাবনীয় সাফল্যকে ‘নকআউট’ আখ্যা স্পিকারের
ছবি : IRNA

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এবং সংঘাতপূর্ণ জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা সাম্প্রতিক সময়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রা লাভ করেছে। ইরানের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সুসজ্জিত সশস্ত্র বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌ শাখা কর্তৃক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক চালকবিহীন ডুবোযান বা আনম্যান্ড আন্ডারওয়াটার ভেহিকল (ইউইউভি) আটকের ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি চরম কৌশলগত পরাজয় বা ‘নকআউট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ইরানের জাতীয় সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।

 

এই দুঃসাহসিক আভিযানিক ঘটনার মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক প্রযুক্তির অন্তর্নিহিত দুর্বলতা ও ইরানের ক্রমবর্ধমান নৌ সক্ষমতার বিষয়টি আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সির (আইআরএনএ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পিকার গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি ছবি প্রকাশ করে এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

 

অত্যন্ত শ্লেষাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় তিনি লিখেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধুনিক ও অত্যন্ত চৌকস প্রযুক্তি সম্পন্ন চালকবিহীন ডুবোযানটিকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় হতভম্ব করে দিয়ে সফলভাবে আটক করেছে আইআরজিসি নৌবাহিনী।

 

তার এই মন্তব্য শুধু একটি সাধারণ রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে তেহরানের দৃঢ় মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান এবং সামরিক আত্মবিশ্বাসের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

 

পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি এবং ওমান উপসাগর-এই তিনটি জলভাগ বিশ্ব বাণিজ্যের, বিশেষ করে জ্বালানি তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সামুদ্রিক পথগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত তাদের নিবিড় গোয়েন্দা নজরদারি এবং সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে এ ধরনের অত্যাধুনিক চালকবিহীন ডুবোযানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে থাকে।

 

শত্রুভাবাপন্ন জলসীমায় নিরবচ্ছিন্ন গুপ্তচরবৃত্তি, মাইন শনাক্তকরণ, সমুদ্রতলের নিখুঁত মানচিত্র তৈরি এবং প্রতিপক্ষের সাবমেরিনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত এসব জলজ ড্রোন বা ডুবোযানগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অতিগোপন প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়।

 

ফলে এ ধরনের একটি উন্নত সামরিক যান প্রতিপক্ষের হাতে অক্ষত অবস্থায় ধরা পড়ার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের গোপন প্রযুক্তিগত তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগপদ্ধতি ও সামরিক কৌশলগত নকশা সরাসরি তেহরানের হাতে চলে যাওয়া, যা ওয়াশিংটনের জন্য এক বিশাল জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি।

 

ইরানের সামরিক বাহিনীর হাতে মার্কিন অত্যাধুনিক ড্রোন বা চালকবিহীন যান আটকের ঘটনা ইতিহাসে এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০১১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপনীয় ও রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম ‘আরকিউ-১৭০ সেন্টিনেল’ নামক একটি স্টিলথ ড্রোন সফলভাবে হ্যাক করে অক্ষত অবস্থায় নিজেদের ভূখণ্ডে নামিয়ে এনেছিল ইরানের চৌকস সাইবার ও অ্যারোস্পেস বাহিনী।

 

পরবর্তীতে সেই ড্রোনের প্রযুক্তি রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং বা বিপরীত প্রকৌশলের মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে ইরান তাদের নিজস্ব ড্রোন প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছিল। সামরিক বিশেষজ্ঞদের প্রবল ধারণা, আইআরজিসি নৌবাহিনীর হাতে আটক হওয়া এই সর্বাধুনিক মার্কিন চালকবিহীন ডুবোযানটির ক্ষেত্রেও ইরান ঠিক একই ধরনের কৌশল অবলম্বন করবে।

 

ফলে সমুদ্রতলে মার্কিন গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার যে একচেটিয়া প্রযুক্তিগত আধিপত্য ছিল, তা এখন চরম হুমকির সম্মুখীন। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষক ও মধ্যপ্রাচ্য পর্যবেক্ষকদের মতে, স্পিকার গালিবাফের এই ‘নকআউট’ মন্তব্যটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

 

কারণ মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ নিজে একসময় আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্সের একজন শীর্ষস্থানীয় কমান্ডার এবং পরবর্তীতে ইরানের জাতীয় পুলিশ বাহিনীর প্রধান হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

ফলে সামরিক বাহিনীর আভিযানিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং কৌশলগত অর্জনের অন্তর্নিহিত গুরুত্ব তিনি খুব ভালোভাবে বোঝেন। তার মতে, বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত মার্কিন নৌবাহিনীর অহংকার এই স্মার্ট ইউইউভি যখন ইরানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে, তখন তা কেবল একটি যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি হয়ে দাঁড়ায় ওয়াশিংটনের সামরিক অহংকার ও মনস্তাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্বের ওপর এক চরম ও অপমানজনক আঘাত।

 

আইআরজিসির এই অভাবনীয় সাফল্য সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, প্রচলিত বিশাল যুদ্ধজাহাজ বা ভারী সমরাস্ত্রের অভাব থাকলেও অপ্রতিসম বা অ্যাসিমেট্রিক যুদ্ধকৌশল এবং আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকরী ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান যেকোনো সময় মার্কিন নৌবাহিনীকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করার সক্ষমতা রাখে।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ড্রোন এবং চালকবিহীন নৌযান নিয়ে পারস্য উপসাগরে একাধিকবার এ ধরনের পাল্টাপাল্টি উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই অঞ্চলে তাদের নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করতে এবং নিজেদের নৌসেনাদের জীবনের ঝুঁকি কমাতে যত বেশি চালকবিহীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে, ইরানও ঠিক ততটাই আগ্রাসী ও উদ্ভাবনী উপায়ে সেগুলোকে প্রতিহত করার কৌশল রপ্ত করে চলেছে।

 

আইআরজিসির এই সর্বশেষ আভিযানিক সাফল্য আন্তর্জাতিক সমরাস্ত্র বাজারে এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় এখন আর পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় নেই।

 

বরং ইরান তাদের নিজস্ব সামরিক উদ্ভাবন, প্রযুক্তির বিপরীত প্রকৌশল এবং সুদৃঢ় প্রতিরোধ সক্ষমতার মাধ্যমে ওই অঞ্চলে এক শক্তিশালী এবং অপ্রতিরোধ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক অঙ্গনে এই নজিরবিহীন ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের জন্য এক বিশাল অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ রণকৌশল জরুরিভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে বলে প্রবলভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

 

ইরনা