ফলে বিশ্বের কোনো পরাশক্তি যদি সামরিক শক্তির দম্ভ দেখিয়ে বা বলপ্রয়োগ করে এই সক্ষমতা ধ্বংস বা পরিবর্তন করার চেষ্টা করে, তবে তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হতে বাধ্য। মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিচালনা পর্ষদের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইরানের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল এই দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে।
ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার ওই বৈঠকে দেওয়া বিস্তারিত বিবৃতিতে ইরানি প্রতিনিধিদল সাম্প্রতিক বছরগুলোর ঘটনাবলির দিকে ইঙ্গিত করে। তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে চালানো বিভিন্ন বিদেশি আগ্রাসন ও হামলার কারণে ইরানের সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো হয়তো আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে।
পারমাণবিক প্রযুক্তির কয়েকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেশটির অবাধ প্রবেশাধিকারও হয়তো সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই ধরনের আক্রমণ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল চালিকাশক্তিকে বিন্দুমাত্র দুর্বল করতে পারেনি।
বিবৃতিতে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলা হয় যে, শত্রুপক্ষ হয়তো ভৌত স্থাপনায় সফলভাবে হামলা চালাতে পারে অথবা গুপ্তহত্যার মাধ্যমে দেশের শীর্ষ বিজ্ঞানীদের হত্যা করতে পারে, কিন্তু যখন কোনো বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি একটি জাতির সাধারণ মানুষের মননে এবং চিন্তাধারায় গভীরভাবে শেকড় গেড়ে বসে, তখন তা কোনোভাবেই ধ্বংস করা যায় না।
বরং তা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আরও বেশি করে টিকে থাকে, নবউদ্যোমে বিকশিত হয় এবং এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত সফলভাবে স্থানান্তরিত হয়। এটিই বর্তমান ইরানের এক অপ্রতিরোধ্য বাস্তবতা, যা পৃথিবীর কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক শক্তির পক্ষেই পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তেহরানের এই বর্তমান শক্তিমত্তার পেছনের কারণগুলোও আইএইএর ওই বৈঠকে অত্যন্ত সাবলীলভাবে তুলে ধরে ইরানি প্রতিনিধিদল। তারা জানায়, রাতারাতি এই সাফল্য আসেনি; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ, দশকের পর দশক ধরে সঞ্চিত অমূল্য জ্ঞান, অত্যন্ত বিশেষায়িত মানবসম্পদ তৈরি এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো উন্নয়নের এক অভাবনীয় ফসল।
এর মাধ্যমে ইরান বর্তমানে একটি পরিপূর্ণ, পরিণত ও অত্যন্ত টেকসই বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার একটি বিশাল অংশ স্বাধীনভাবে পূরণ করে চলেছে।
ইরানের এই অত্যাধুনিক পারমাণবিক প্রযুক্তি কেবল গবেষণাগারেই আবদ্ধ নেই, বরং দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে-যেমন আধুনিক কৃষি, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, উন্নত জাতের ফসলের উন্নয়ন, ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাদ্য সংরক্ষণ এবং পানি ও সারের ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়াতে দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এর পাশাপাশি, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং ভারী শিল্প খাতে রেডিওআইসোটোপের উৎপাদন ও ব্যবহার, বিকিরণ প্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্তকরণ এবং বিকিরণভিত্তিক বিভিন্ন জটিল প্রযুক্তির সফল ব্যবহারে ইরান আজ অভাবনীয় সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এসব কার্যক্রমে সার্বক্ষণিক বিকিরণ সুরক্ষা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ এবং শনাক্তকরণের মতো আধুনিক সক্ষমতাও অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিজেদের সফলতার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি বৈঠকে পশ্চিমা দেশগুলোর চাপিয়ে দেওয়া একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য অমানবিক বিধিনিষেধেরও তীব্র সমালোচনা করে ইরান।
দেশটির প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা এসব সম্পূর্ণ অবৈধ ও একপেশে পদক্ষেপ ইরানের প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রাপ্তি, আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে জ্ঞান ও প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির স্বাভাবিক সুযোগকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে রেখেছে।
তেহরানের দাবি, এ ধরনের বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর যে অবিচ্ছেদ্য ও জন্মগত অধিকার রয়েছে, তার সরাসরি পরিপন্থি।
একই সঙ্গে, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) আওতাধীন উন্নত দেশগুলোর ওপর উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে সহযোগিতা করার যে আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এসব একতরফা নিষেধাজ্ঞা সেই নীতির সঙ্গেও সম্পূর্ণভাবে সাংঘর্ষিক।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নীতিনির্ধারণী অঙ্গগুলোর প্রতি গভীর আহ্বান জানিয়ে ইরানি প্রতিনিধিদল বলেছে, অবিলম্বে এ ধরনের অবৈধ নিষেধাজ্ঞা ও অন্যায্য বিধিনিষেধ বন্ধের জন্য তাদের সোচ্চার হওয়া উচিত।
পাশাপাশি, আইএইএর সাম্প্রতিক প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনে পশ্চিমা দেশগুলোর একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর আগ্রাসনের কারণে ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তার কোনো বস্তুনিষ্ঠ উল্লেখ না থাকায় তেহরান চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
একটি আন্তর্জাতিক ও নিরপেক্ষ সংস্থা হিসেবে আইএইএর প্রতিবেদনে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এড়িয়ে যাওয়াকে তারা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছে। পরিশেষে, এই অসম্পূর্ণ প্রতিবেদনটি সাধারণ সম্মেলনে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপনের আগেই এতে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রকৃত সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য আইএইএর প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে ইরান।