হুতিরা সৌদি ভূখণ্ডকে লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে, যার জবাবে রিয়াদও বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণের জেরে পুরো অঞ্চলজুড়ে নতুন করে এক গভীর অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও হুতিপন্থি সাংবাদিক হুসেইন আল-বুখাইতি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ইয়েমেনের বর্তমান এই ভয়াবহ উত্তেজনার সম্পূর্ণ দায়ভার সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন জোটকেই বহন করতে হবে।
প্রায় দুই মাস আগে ইয়েমেনের রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে চালানো বোমাবর্ষণের মাধ্যমেই মূলত এই নতুন সংঘাতের সূত্রপাত ঘটানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
পরিস্থিতির পেছনের ইতিহাস তুলে ধরে আল-বুখাইতি উল্লেখ করেন যে, এর আগে ২০২৩ সালে দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য হুতিদের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা শান্তি চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল সৌদি জোট।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সেই সমঝোতা চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে রিয়াদ চরম ঔদাসীন্য দেখায়। চুক্তি বাস্তবায়নের পথে হাঁটার পরিবর্তে তারা উল্টো পথ বেছে নেয়। এর অংশ হিসেবে ঠিক দুই মাস আগে রাজধানীর সানা বিমানবন্দরের প্রধান রানওয়েতে বর্বরোচিত বিমান হামলা চালায় সৌদি জোট।
অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হলো, যখন সৌদির যুদ্ধবিমানগুলো ওই হামলা চালায়, ঠিক সেই মুহূর্তেই ইরান সফর শেষ করে ফেরা হুতি আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় বেশ কজন নেতার একটি বিশেষ বিমান সানা বিমানবন্দরে অবতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
এই হামলার মাধ্যমে একদিকে যেমন শান্তি প্রক্রিয়াকে চরমভাবে পদদলিত করা হয়েছে, অন্যদিকে বিমানযাত্রীসহ নেতৃবৃন্দের জীবনকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে হুতিপক্ষ।
এই সামরিক আগ্রাসনের পরই মূলত হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয় বলে জানান হুসেইন আল-বুখাইতি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, সৌদি ভূখণ্ড এবং বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোকে নিজেদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছে হুতি যোদ্ধারা।
তবে আকস্মিক এই আক্রমণ চালানোর আগে সৌদির নীতি-নির্ধারকদের পর্যাপ্ত সময় ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। হুতিদের পক্ষ থেকে সৌদি প্রশাসনকে জোরালো অনুরোধ জানানো হয়েছিল যাতে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেনি অঞ্চলগুলোর ওপর থেকে অবৈধ ও অবর্ণনীয় নৌ-অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
সেই সঙ্গে পূর্বের সমঝোতা চুক্তি বা রোডম্যাপ দ্রুত বাস্তবায়ন করার সুনির্দিষ্ট তাগিদও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে রিয়াদ সেই কূটনৈতিক পথ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সামরিক শক্তির প্রদর্শন অব্যাহত রাখে।
হুতিদের বারবার দেওয়া সতর্কবাণী এবং অনুরোধের জবাবে সৌদি আরব সম্পূর্ণ আগ্রাসী ও ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেয় বলে মন্তব্য করেন ওই রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সমঝোতার পরিবেশ তৈরি না করে উল্টো তারা সানা বিমানবন্দরকে সুনির্দিষ্টভাবে টার্গেট করে বোমা বর্ষণ করে।
এই ধরনের বেপরোয়া সামরিক উসকানিই মূলত দুই পক্ষের মধ্যকার চলমান শান্তি প্রচেষ্টাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। আল-বুখাইতির মতে, ইয়েমেনের আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং বেসামরিক অবকাঠামোতে এই ধরনের অনৈতিক হামলার মাধ্যমেই বর্তমান সংকটের বীজ বপন করা হয়েছে।
তাই ইয়েমেনের বর্তমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির জন্য অন্য কাউকে দায়ী না করে সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের একরোখা নীতিকেই দায়ী করা উচিত। বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম আলজাজিরার বরাত দিয়ে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান জটিল সমীকরণ এবং ক্রমবর্ধমান সংঘাতের নেপথ্য কারণগুলোকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উন্মোচন করেছে।