মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬
২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলি নাগরিকদের ওপর হামলার শঙ্কা

বাংলাদেশসহ একাধিক দেশে ভ্রমণে কঠোর সতর্কতা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম

বাংলাদেশসহ একাধিক দেশে ভ্রমণে কঠোর সতর্কতা
ছবি : Collected

বিশ্বজুড়ে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের ওপর বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও ব্যক্তির সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে এক কঠোর ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল।

 

এই সতর্কবার্তায় বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ইসরায়েলিদের ভ্রমণ ও অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম রাষ্ট্র বাংলাদেশের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

 

বাংলাদেশ ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক নেই এবং প্রথাগতভাবে ইসরায়েলি নাগরিকরা কখনোই বাংলাদেশে ভ্রমণ করেন না। তা সত্ত্বেও এই সতর্কবার্তায় বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে বেশ কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

মূলত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়নের অংশ হিসেবেই তেল আবিব এই নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট তাদের এক বিশদ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে।

 

ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রকাশিত এই নতুন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বৈশ্বিক নিরাপত্তার বর্তমান অস্থিতিশীল রূপটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সামনেই ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র উৎসবের দিন আসন্ন।

 

এই দিনগুলোকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইসরায়েলি নাগরিক এবং ইহুদি স্থাপনাগুলোর ওপর বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী বা একক ব্যক্তির আক্রমণ চালানোর অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার ঝুঁকি বিরাজ করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমুখী সংঘাত এই ঝুঁকিকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

বর্তমানে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস, লেবাননভিত্তিক শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ এবং আঞ্চলিক পরাশক্তি ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের যে তীব্র ও প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত চলছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ ইসরায়েলি নাগরিকদের আন্তর্জাতিক চলাচলের ওপর।

 

এই চলমান যুদ্ধের কারণে পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই এখন ইসরায়েলিদের জন্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিকূল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এই নিরাপত্তা ঝুঁকির মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে আগামী ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে।

 

উল্লেখ্য, এই সময়ে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের পরিচালিত ঐতিহাসিক ও প্রাণঘাতী হামলার তৃতীয় বার্ষিকী পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এই তিন বছর পূর্তিকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার বড় শহরগুলোতে বিশাল আকারের ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হতে পারে বলে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দৃঢ়ভাবে আশঙ্কা করছে।

 

এই ধরনের তীব্র আবেগময় ও স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ সমাবেশগুলো যেকোনো মুহূর্তে ইসরায়েলি ও ইহুদিদের বিরুদ্ধে চরম সহিংস রূপ ধারণ করতে পারে। সংস্থাটি তাদের গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সতর্ক করেছে যে, হামাস কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা বর্তমানে ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতেও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুগুলোর ওপর আকস্মিক হামলা চালানোর জন্য গোপনে কাজ করে যাচ্ছে।

 

একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত ইসরায়েলি নাগরিকদের ওপর হামলার প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

 

মধ্যপ্রাচ্য ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা বিশ্লেষণ করে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল জানিয়েছে যে, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানের কাছাকাছি থাকা দেশগুলো বর্তমানে ইসরায়েলি নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

বিশেষ করে ইরান সীমান্তবর্তী বা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র যেমন আজারবাইজান, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই হামলার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া জর্ডান, কাতার, সোমালিল্যান্ড এবং মিসরের মতো দেশগুলো, যার মধ্যে বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সিনাই উপত্যকাও অন্তর্ভুক্ত, ইসরায়েলিদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

এই দেশগুলোতে কোনো ইসরায়েলি নাগরিক বর্তমানে অবস্থান করে থাকলে তাদেরকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ওই এলাকা ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য জরুরি ও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 

এমনকি এসব দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যদি কোনো ইসরায়েলি নাগরিকের ট্রানজিট ফ্লাইটও থাকে, তবুও নিরাপত্তার স্বার্থে তাদেরকে কোনো অবস্থাতেই বিমানবন্দর ভবনের বাইরে বের না হওয়ার জন্য কড়াভাবে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

 

ভ্রমণ ঝুঁকির এই বিশদ তালিকার পাশাপাশি বেশ কিছু দেশে ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রবেশের ওপর সম্পূর্ণ আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সংস্থাটি। নতুন এই নির্দেশনা অনুযায়ী, ইরাক, কুর্দিস্তান অঞ্চল, ইয়েমেন, ইরান, সিরিয়া, লেবানন এবং সৌদি আরবে ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রবেশ আইনগতভাবে পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

 

এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র একক ইসরায়েলি নাগরিকদের জন্যই নয়, বরং যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে, তাদের জন্যও সমানভাবে ও কঠোরভাবে কার্যকর হবে। সবশেষে, বৈশ্বিক নিরাপত্তার একটি বৃহত্তর মানচিত্র তুলে ধরে সংস্থাটি আরও বেশ কিছু দেশকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

 

এই তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এবং আফ্রিকা মহাদেশের লিবিয়া, আলজেরিয়া ও সোমালিয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মতে, এই দেশগুলোতে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব অত্যন্ত প্রবল থাকায় যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। তাই নাগরিকদের নিজেদের সুরক্ষা ও প্রাণ রক্ষার্থে এসব দেশে ভ্রমণ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

 

- জেরুজালেম পোস্ট