শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতের ঐতিহাসিক মসজিদ ধ্বংস, মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে ওয়াইসির তীব্র ক্ষোভ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম

ভারতের ঐতিহাসিক মসজিদ ধ্বংস, মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে ওয়াইসির তীব্র ক্ষোভ
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর কালেক্টরেট চত্বরে অবস্থিত একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মসজিদ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কড়া সমালোচনা করে সর্বভারতীয় মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীনের (এআইএমআইএম) প্রধান ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা আসাদউদ্দিন ওয়াইসি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি ও আইনি ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানতে চেয়েছেন, ভারতের সংবিধানে প্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার যে মৌলিক নিশ্চয়তা রয়েছে, তা কি বর্তমানে মুসলমানদের ক্ষেত্রে আর কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়?

 

ঐতিহাসিক ও আইনি নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত তুচ্ছ ও ভিত্তিহীন কারণে দেশের নানা প্রান্তে মুসলমানদের পবিত্র উপাসনালয়গুলো কেন ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রীয় মদতে ধ্বংস করা হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

 

বিতর্কিত ওই মসজিদটির ঐতিহাসিক পটভূমি ও গুরুত্ব তুলে ধরে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিস্তারিত পোস্টে জানান, ১৯১১ সালের পুরোনো সরকারি নথিতেও ওই স্থানে মসজিদটির সুস্পষ্ট ও অকাট্য অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে।

 

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সেখানে স্থানীয় মুসলমানরা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে ও ধারাবাহিকভাবে তাদের দৈনন্দিন নামাজ আদায় করে আসছেন। আইনি পরিভাষায় ও ইসলামী আইনে এটিকে ব্যবহারকারীর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

 

ভারতের বিদ্যমান ওয়াকফ আইনের অধীনে এ ধরনের সম্পত্তি সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত থাকার কথা। ওয়াইসির দাবি, সাহারানপুর কালেক্টরেট ভবন নির্মাণের অনেক আগে থেকেই সেখানে এই মসজিদটি সগৌরবে বিদ্যমান ছিল।

 

তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, কিছু মানুষের কাছে হয়তো এই মসজিদটি চোখের বালি হতে পারে বা তাদের মনে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু শুধু কারও মনের খেয়ালে বা বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে বুলডোজার দিয়ে একটি ঐতিহাসিক ধর্মীয় উপাসনালয় ভেঙে ফেলার কোনো আইনি বা নৈতিক ভিত্তি থাকতে পারে না।

 

মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা সংখ্যাগরিষ্ঠের দয়ার ওপর নির্ভরশীল নয় বলেও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। মসজিদ সংলগ্ন ওই জমির ওপর বর্তমান সরকারের মালিকানা দাবির যৌক্তিকতা ও আইনি ভিত্তি নিয়েও কড়া প্রশ্ন তুলেছেন এআইএমআইএম প্রধান।

 

তিনি ভারতের সুপরিচিত তামাদি আইন এবং স্থাবর সম্পত্তির দখল সংক্রান্ত আইনি বিধানের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। ওয়াইসি আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, রাষ্ট্র বা সরকার চাইলেই সীমাহীন সময় পার হওয়ার পর হঠাৎ করে একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠে কোনো প্রাচীন সম্পত্তির মালিকানা দাবি করতে পারে না।

 

এটি আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি একটি বিষয়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জায়গাটি প্রকাশ্যে, নিরবচ্ছিন্নভাবে এবং সর্বসাধারণের সামনে মুসলমানদের আইনি ও ব্যবহারিক দখলে ছিল। তাই রাষ্ট্রের নিজস্ব আইনি যুক্তি মেনে নিলেও দীর্ঘদিনের বিরোধী দখলের নীতি অনুযায়ী ওই নির্দিষ্ট স্থানের ওপর স্থানীয় মুসলমানদের নিরঙ্কুশ আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আদালত বা প্রশাসনের বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।

 

সাহারানপুর জেলা প্রশাসনের কঠোর নির্দেশে এবং স্থানীয় আদালতের আদেশের পরপরই মূলত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি অপসারণের কাজ শুরু হয়। জানা যায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় জেলা জজের আদালত মসজিদ কমিটির করা একটি আপিল সরাসরি খারিজ করে দেয় এবং সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আগের নির্দেশটিই বহাল রাখে।

 

এর আগে গত ১৭ জুলাই সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত সরকারি মূল্যবান জমি অবৈধভাবে দখল করার অভিযোগে এই প্রাচীন মসজিদটি সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার নির্দেশ জারি করেছিল। একই সঙ্গে ওই জমি দীর্ঘকাল ব্যবহারের দায়ে মসজিদ কমিটির ওপর প্রায় ৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণও আরোপ করা হয়েছিল।

 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহারানপুরের ডিআইজি অভিষেক সিং গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শহরের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্ত রাখতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থানে বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

 

পাশাপাশি, যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক গুজব বা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রশাসনের তরফ থেকে কঠোর সাইবার নজরদারি চালানো হচ্ছে। মসজিদ ধ্বংসের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছে।

 

সমাজবাদী পার্টির (এসপি) সাংসদ ইকরা হাসান অভিযোগ করেছেন যে, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি সাহারানপুরে যাওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয় প্রশাসন তাকে বাধা দেয় এবং কাইরানা এলাকায় তাকে নিজ বাড়িতে জোরপূর্বক গৃহবন্দি করে রাখে, যা তার গণতান্ত্রিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন।

 

অন্যদিকে, প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা ও কংগ্রেস সাংসদ ইমরান মাসুদ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন, মসজিদটি ১৯১১ সালেরও আগে থেকে ওই স্থানে প্রতিষ্ঠিত ছিল।

 

অত্যন্ত সুকৌশলে এবং পরিকল্পিতভাবে ওয়াকফ বোর্ডকে এই মামলার আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে বলে তিনি গুরুতর অভিযোগ করেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, এই অন্যায় ও বেআইনি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে চূড়ান্ত আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া হবে।

 

- ডেকান ক্রনিকল