শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩৭৫

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩৭৫
ছবি : Collected

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত নেপাল এবং চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। আকস্মিক বন্যা এবং প্রলয়ঙ্করী ভূমিধসের কারণে এই অঞ্চলে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৩৭৫ জন মানুষের প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

মর্মান্তিক এই দুর্যোগের দশ দিন পার হয়ে গেলেও এখনও নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫ হাজার ৫৩১ জন মানুষ। শনিবার প্রকাশিত দুই দেশের সরকারি পরিসংখ্যান থেকে এই ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির চিত্র উঠে এসেছে। উদ্ধারকর্মীরা দিনরাত কাজ করে গেলেও সময়ের সাথে সাথে নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

 

নেপালের রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) তাদের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই বিপর্যয়ের একটি অত্যন্ত করুণ চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেবল নেপালের ভূখণ্ডেই প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৩৪৪ জন।

 

পাহাড়ি জনপদগুলো এখন যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, দুর্যোগের দশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও দেশটিতে এখনও প্রায় ৫ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে অন্তত ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।

 

পর্যটন মৌসুম হওয়ায় এই অঞ্চলে ট্রেকিং এবং ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বহু বিদেশি পর্যটক অবস্থান করছিলেন, যারা এই আকস্মিক বিপর্যয়ের মর্মান্তিক শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে, হিমালয়ের অপর প্রান্তে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শিজাং বা তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলেও এই বিপর্যয়ের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।

 

চীনা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, তিব্বত অংশে এই আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং এখনও ৫৩১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল এবং চীনের সরকারি পরিসংখ্যান একত্রিত করলে দেখা যায়, দুই দেশে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৮৫০ জন বিদেশি নাগরিক।

 

একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক বিদেশি পর্যটকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা গেছে, এই মহাবিপর্যয়ের সূত্রপাত ঘটেছিল গত ২৬ আগস্ট।

 

ওইদিন নেপালের বিখ্যাত লাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার বা ১৭ হাজার ৬০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত একটি বিশালাকার হিমবাহ আকস্মিকভাবে ভেঙে পড়ে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের হিমবাহগুলো ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে, আর এই হিমবাহ ধস তারই একটি ভয়াবহ পরিণতি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

হিমবাহটি ভেঙে পড়ার পর বরফখণ্ডের সাথে পাহাড়ের বিশাল পাথরের স্তূপ এবং কাদা-মাটি মিশে এক প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি করে। এই বিপুল জলরাশি ও কাদার স্রোত প্রচণ্ড বেগে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে এসে সীমান্তবর্তী উপত্যকাগুলো দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং বিস্তীর্ণ জনপদ নিমেষে প্লাবিত করে দেয়।

 

পাহাড় থেকে নেমে আসা এই ধ্বংসাত্মক কাদা ও জলের স্রোতে নেপালের বেশ কয়েকটি জেলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং এবং কাভ্রে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। স্থানীয় পাহাড়ি গ্রামগুলো মাটির নিচে চাপা পড়েছে, ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু।

 

এমনকি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু উপত্যকার একাংশও এই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। অন্যদিকে, চীনের শিজাং অঞ্চলেও বিপর্যয়ের মাত্রা অত্যন্ত তীব্র। পাহাড় ধসে আসা বিশাল ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে গেছে নেপাল-চীনের মধ্যকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ গিরং সীমান্ত ক্রসিং। এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার সড়ক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

 

দুর্যোগের প্রথম দিন থেকেই দুই দেশের সামরিক ও বেসামরিক উদ্ধারকারী দলগুলো নিখোঁজদের সন্ধানে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, বৈরী আবহাওয়া এবং বিশাল ধ্বংসাবশেষের স্তূপ উদ্ধার কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

 

ভারী যন্ত্রপাতি দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে উদ্ধারকর্মীদের খালি হাতেই পাথর ও কাদা সরিয়ে সন্ধান চালাতে হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একের পর এক মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার দৃশ্য স্থানীয়দের মনে গভীর শোক ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যত দিন পর্যন্ত নিখোঁজদের একটি গ্রহণযোগ্য সুরাহা না হচ্ছে, তত দিন এই নিরবচ্ছিন্ন সন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এই চরম মানবিক সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

 

- আরএনএস