জেনারেশন জি বা জেন-জি’র নজিরবিহীন ও সাড়াজাগানো বিক্ষোভের পর এবার দেশের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং কাঠামোগত উন্নয়নের দাবিতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের রাজপথ প্রকম্পিত করছে এই অদম্য শিশু-কিশোররা।
শুক্রবার আন্তর্জাতিকভাবে স্বনামধন্য সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায় প্রকাশিত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে ভারতের চলমান এই নতুন গণবিক্ষোভের চিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দেশের গ্রামীণ স্কুলগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা এবং মৌলিক সুবিধার তীব্র অভাবের বিরুদ্ধে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এই অভূতপূর্ব প্রতিবাদ সমগ্র ভারতসহ আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
আল জাজিরায় প্রকাশিত ওই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের উত্তরপ্রদেশের সমূহি ভাটপুরওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ দেশের অন্তত দশটি রাজ্যের প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকার হাজার হাজার শিক্ষার্থী এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছে।
এসব শিশু-কিশোরদের অভিযোগ অত্যন্ত স্পষ্ট, বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক। তারা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জরাজীর্ণ ও বিপজ্জনক স্কুল ভবন, চরম মাত্রায় শিক্ষক সংকট, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাব, বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট এবং অত্যন্ত নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর মধ্যাহ্নভোজ বা মিড-ডে মিল বিতরণের কঠোর প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
এই মৌলিক ও অপরিহার্য অধিকারগুলো নিশ্চিত করার দাবিতে তারা কেবল শ্রেণিকক্ষই বর্জন করেনি, বরং হাতে বিভিন্ন দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাজপথে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে নিজেদের অধিকারের পক্ষে জোরালো আওয়াজ তুলেছে।
একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের এমন অবর্ণনীয় দুর্দশা এবং তাদের এই প্রতিবাদী রূপ আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার চরম অবহেলার চিত্রই নতুন করে সামনে এনেছে। এই শিশু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পেছনে সাম্প্রতিক এক সফল ছাত্র-আন্দোলনের গভীর প্রভাব রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে একের পর এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ন্যক্কারজনক ঘটনা এবং দেশজুড়ে বিরাজমান চরম বেকারত্ব নিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল জেন-জি বা বর্তমান তরুণ প্রজন্ম।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামক একটি অভিনব ও তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন সংগঠনের ব্যানারে এই যৌক্তিক আন্দোলন এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, জনরোষ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
তরুণদের সেই সফল, সুসংগঠিত ও লক্ষ্যভেদী আন্দোলনের রেশ ধরেই এবার শিশু শিক্ষার্থীরা তাদের নিজেদের অধিকার আদায়ের এই নতুন ও ব্যতিক্রমী আন্দোলন শুরু করেছে। বড়দের দেখানো প্রতিবাদের পথ অনুসরণ করে ছোটরাও যে এখন নিজেদের অধিকার সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন হয়ে উঠেছে, তা ভারতের চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন যুগের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শিশু শিক্ষার্থীদের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ন্যায্য আন্দোলনে শুরু থেকেই পূর্ণ সমর্থন ও দিকনির্দেশনা জুগিয়ে যাচ্ছে জেন-জি’র নেতৃত্বাধীন সংগঠন সিজেপি। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ দিনটি থেকেই তারা ‘স্কুল ঠিক করো’ শীর্ষক একটি দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
এই সময়োপযোগী কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো গ্রামীণ ও অবহেলিত স্কুলগুলোর ভগ্নদশা দূর করে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা। সিজেপি’র এই সরাসরি সমর্থন জেন-আলফার আন্দোলনকে আরও বেশি সুসংগঠিত, বেগবান ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।
তরুণ ও শিশুদের এই বিরল সম্মিলিত প্রয়াস চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করছে যে, বর্তমান প্রজন্মের কাছে শিক্ষা কেবল একটি খাতা-কলমের বিষয় বা প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি তাদের মানসম্মতভাবে বেঁচে থাকার এবং আগামীর বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই চলমান অস্থিরতা ও বিক্ষোভের বিষয়ে ভারতের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ এবং মানবাধিকার কর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা অত্যন্ত হতাশার সাথে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ২০০৯ সালে ভারতীয় সংসদে শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে ‘বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার আইন’ (আরটিই) পাস করা হয়েছিল।
এই ঐতিহাসিক আইনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল দেশের প্রতিটি শিশুকে ধর্ম, বর্ণ ও অঞ্চল নির্বিশেষে বৈষম্যহীনভাবে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করা। কিন্তু আইন পাসের প্রায় দেড় দশক পার হয়ে যাওয়ার পরও ভারতের অসংখ্য সরকারি ও গ্রামীণ স্কুলে শিক্ষার ন্যূনতম ও মৌলিক সুবিধাগুলোর চরম অভাব রয়ে গেছে, যা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু কাগজে-কলমে আইন তৈরি করে রাখলেই চলবে না; এর বাস্তব ও কঠোর প্রয়োগের অভাবে গ্রামীণ স্কুলগুলো আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। শিশু শিক্ষার্থীদের এই চলমান আন্দোলন মূলত প্রশাসনের সেই দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতারই একটি স্বতঃস্ফূর্ত ও তীব্র বহিঃপ্রকাশ।
আল জাজিরার ওই বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই গণবিক্ষোভের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কেও নীতিনির্ধারকদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য শিশু-কিশোরদের এই লাগাতার আন্দোলন একটি অভাবনীয়, জটিল ও বিশাল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতে রাজপথের এই প্রতিবাদীদের কেবল শিশু বা কিশোর বলে মনে হলেও, প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য ভারতের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে এই জেন-আলফা প্রজন্মের একটি বিশাল অংশ নতুন ও তরুণ ভোটার হিসেবে আবির্ভূত হবে।
আজ যারা ভগ্ন স্কুল ভবন আর নিম্নমানের খাবারের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে নিজেদের অধিকার দাবি করছে, আগামী নির্বাচনে তারাই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যালট বাক্সে নিজেদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটাতে পারে।
তাই সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের জন্য এই আন্দোলনকে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সাধারণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এবং তরুণ প্রজন্মের আস্থা অর্জনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।