শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
কিরগিজস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলন

বৈশ্বিক সংস্কার ও অংশীদারিত্বের লক্ষ্যে ‘বিশকেক ঘোষণা’ স্বাক্ষর

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:০০ পিএম

বৈশ্বিক সংস্কার ও অংশীদারিত্বের লক্ষ্যে ‘বিশকেক ঘোষণা’ স্বাক্ষর
ছবি : Collected

কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতারা সর্বসম্মতিক্রমে যুগান্তকারী ‘বিশকেক ঘোষণা’-তে স্বাক্ষর করেছেন।

 

বিশ্ব রাজনীতির এক চরম উত্তেজনাকর ও পরিবর্তনশীল মুহূর্তে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার আমূল সংস্কার, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের আধুনিকায়ন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার এক নতুন ও টেকসই দিগন্ত উন্মোচনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

 

একই সঙ্গে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠার পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও নিবিড় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার এবারের শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রপ্রধানদের কাউন্সিলের বৈঠকে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সমান ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সময়োপযোগী বার্তা দেওয়া হয়েছে।

 

নেতারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক শাসনকাঠামোকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক এবং যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। এর জন্য এমন সব নতুন নীতি, আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সমান ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়।

 

একই সঙ্গে এসব বৈশ্বিক সিদ্ধান্তের ইতিবাচক ফলাফল ও সুফলগুলো যেন কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির কুক্ষিগত না থেকে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের সাধারণ মানুষ সমানভাবে ভোগ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করার ওপর ঘোষণাপত্রে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে।

 

বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো দেশ যেন বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে বাদ না পড়ে, সেটিই এই ঘোষণার অন্যতম মূল ভিত্তি। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা নিজেদের একটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও সহযোগিতাপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।

 

বিশকেক ঘোষণায় সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তারা সমমনা ও আগ্রহী অন্যান্য স্বাধীন রাষ্ট্র, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বহুপাক্ষিক জোট ও সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও আন্তরিকভাবে আগ্রহী।

 

এই সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে তারা বৈশ্বিক শান্তি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। ঘোষণাপত্রে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, এই সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার সম্পর্ক মূলত একটি অত্যন্ত ব্যাপক, সুদূরপ্রসারী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে অভাবনীয় সহায়তা প্রদান করবে।

 

আধুনিক বিশ্বের সমসাময়িক ও অত্যন্ত সংবেদনশীল বিভিন্ন বৈশ্বিক বিষয় বা আলোচ্যসূচিও বিশকেক ঘোষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির নিরাপদ, নৈতিক এবং মানবকল্যাণমুখী ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর সম্মেলনে উপস্থিত বিশ্বনেতারা গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন।

 

প্রযুক্তি যেন মানবসভ্যতার জন্য কোনো বিপর্যয় বা হুমকির কারণ না হয়ে বরং সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়, সে বিষয়ে একটি সম্মিলিত বৈশ্বিক আইনি রূপরেখা প্রণয়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

 

এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা ও পরিবেশ রক্ষার মাধ্যমে বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়েও সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের অভিন্ন ও দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

 

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও ঘোষণায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে, যাতে করে একটি সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্ব অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

 

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা প্রতিষ্ঠার পঁচিশতম বার্ষিকীর এই বিশেষ ও ঐতিহাসিক ক্ষণটিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত রাষ্ট্রপ্রধান ও শীর্ষ প্রতিনিধিরা মূল ‘বিশকেক ঘোষণা’র পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আরও সাতাশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিতে স্বাক্ষর করেছেন।

 

এই বিপুলসংখ্যক যুগান্তকারী চুক্তি ও বিস্তারিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ঘটনাটি মূলত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্পর্ককে আগামী দিনগুলোতে আরও নিবিড় ও সুদৃঢ় করার একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের এই সুদূরপ্রসারী বিশকেক ঘোষণা এবং আনুষঙ্গিক সাতাশটি চুক্তির মাধ্যমে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, বিকল্প এবং বহুমুখী বৈশ্বিক জোট হিসেবে আরও একধাপ শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেল, যা আগামী দিনের বৈশ্বিক সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

- পার্সটুডে