প্রকৃতির নির্মম রুদ্ররোষে বিস্তীর্ণ উপত্যকায় আটকে পড়া মুমূর্ষু মানুষদের জীবন বাঁচাতে তিনি নিজের জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে নিরলসভাবে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মৃত্যুর মুখ থেকে জীবনের সন্ধানে তার এই সাহসী ও আপসহীন লড়াই ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বৈশ্বিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসার জন্ম দিয়েছে।
দুর্যোগপূর্ণ বিরূপ আবহাওয়া, অবিরাম বৃষ্টিপাত এবং দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশের সকল প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে তিনি ইতোমধ্যে শতাধিক শ্বাসরুদ্ধকর ও অতি-ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার মিশনে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বন্যাকবলিত অঞ্চলে আটকে পড়া, গৃহহীন ও নিখোঁজ মানুষদের সন্ধান করা এবং জীবিতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার এই চ্যালেঞ্জিং কাজে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আত্মনিয়োগ করেছেন। তার এই অসামান্য অবদান নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম সিএনএন এবং দ্য ওয়াল-কে দেওয়া এক বিশেষ ও আবেগঘন সাক্ষাৎকারে ক্যাপ্টেন প্রিয়া অধিকারী তার এই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানের রোমহর্ষক ও শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতার কথা অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
তিনি জানান, দুর্যোগকবলিত ওই উপত্যকাগুলোর আকাশপথ বর্তমানে যেকোনো সময়ের তুলনায় অত্যন্ত ব্যস্ত এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। কারণ, একই সঙ্গে অসংখ্য সামরিক ও বেসামরিক রেসকিউ হেলিকপ্টার এবং ছোট আকারের উদ্ধারকারী উড়োজাহাজ এই একই অঞ্চলে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ায় আকাশে এক ধরনের বিরল যানজট ও আকাশপথে সংঘর্ষের ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে।
এর পাশাপাশি একজন বৈমানিক হিসেবে তার জন্য সবচেয়ে বড় কারিগরি ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ ছিল সম্পূর্ণ কর্দমাক্ত, পিচ্ছিল এবং দৃশ্যত অনিরাপদ ভৌগোলিক এলাকায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে হেলিকপ্টার নিরাপদে অবতরণ করানো।
বন্যার প্রবল তোড়ে পাহাড়ি মাটি মারাত্মকভাবে ধসে যাওয়ায় এবং সমতল ভূমি পুরু কাদায় ঢাকা পড়ায় একটি ভারী হেলিকপ্টার নামানোর জন্য সামান্যতম নিরাপদ ও শক্ত স্থান খুঁজে পাওয়াও ছিল এক দুঃসাধ্য ব্যাপার।
অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়ের ঢালু স্থানে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে তাকে কপ্টার নামাতে হয়েছে। তবুও তিনি নিজের অর্জিত চরম পেশাদারিত্ব, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং অসীম সাহসের ওপর ভর করে এই অসম্ভবকে বারবার সম্ভব করে চলেছেন।
উদ্ধারকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে কেবল একটি যান্ত্রিক বা পেশাগত দায়িত্ব পালনের মধ্যেই ক্যাপ্টেন প্রিয়ার অসামান্য ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে উল্লেখ করেন যে, উদ্ধার অভিযানের সময় মৃত্যুকূপ থেকে তুলে আনা প্রতিটি বিপন্ন মানুষের সঙ্গে তার এক গভীর, মানবিক ও আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
জীবন-মৃত্যুর এক চরম সন্ধিক্ষণে থাকা এই অসহায় মানুষগুলোকে যখন তিনি কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করে নিজের হেলিকপ্টারে তুলে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসেন, তখন তাদের চোখেমুখে যে পরম স্বস্তি, বেঁচে ফেরার আনন্দ ও সীমাহীন কৃতজ্ঞতার ছাপ ফুটে ওঠে, সেটিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
তার এই নিরবচ্ছিন্ন, অকুতোভয় ও সাহসী তৎপরতার ফলে ইতোমধ্যে দুই শতাধিক বিপন্ন নারী, পুরুষ ও শিশুকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে নিখোঁজ হওয়া অগণিত মানুষের সন্ধানে এখনও দিনরাত অবিরাম অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন এই অকুতোভয় নারী বৈমানিক।
উদ্ধার অভিযানের এই অবিস্মরণীয় ও বীরত্বপূর্ণ তৎপরতার পাশাপাশি ক্যাপ্টেন প্রিয়া নেপালের বর্তমান মানবিক সংকটের এক চরম, বাস্তব ও ভয়াবহ চিত্রও বিশ্ববাসীর সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
তিনি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে জানান যে, এই অভাবনীয় পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দুর্গত মানুষদের প্রাণ বাঁচাতে অবিলম্বে আরও বিপুল পরিমাণ জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন। বিশেষ করে, নিহতদের মৃতদেহ অত্যন্ত সসম্মানে, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক বডি ব্যাগসহ আনুষঙ্গিক জরুরি চিকিৎসা ও উন্নত উদ্ধার সরঞ্জামের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
এই লজিস্টিক ঘাটতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে পূরণ করা না গেলে সামনের দিনগুলোতে উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে তিনি গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেন। প্রকৃতির এই ভয়াবহ তাণ্ডবের মুখে নেপালের সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের জীবন বাঁচাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, দাতা সংস্থা এবং মানবিক সংগঠনগুলোকে দ্রুত এগিয়ে আসার জন্য তিনি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।