শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষক ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৩০ পিএম

কৃষক ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের!
ছবি : Collected

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুতে পূর্ববর্তী সরকারের শাসনামলে নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে যেসব কৃষক এবং শিক্ষক সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত আইনি মামলা নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহারের এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছে নবনির্বাচিত টিভিকে সরকার।

 

বুধবার রাজ্য বিধানসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা জানানো হয়। সরকারের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে ২০২১ সালের মে মাস থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দীর্ঘ এই সময়ে আইনি জটিলতায় জর্জরিত থাকা বহু সংখ্যক অভিযুক্ত শিক্ষক ও সাধারণ কৃষক অবশেষে একটি বিরাট আইনি স্বস্তি লাভ করতে চলেছেন বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

 

রাজ্য বিধানসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১১০ নম্বর ধারার আইনি ক্ষমতাবলে এই বিশেষ সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করেন তামিলনাড়ুর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সি. জোসেফ বিজয়। বিধানসভায় দেওয়া তাঁর দীর্ঘ ও আবেগপূর্ণ ভাষণে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক জীবিকা, সাংবিধানিক অধিকার আদায় এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন ন্যায্য দাবির পক্ষে যারা রাজপথে নেমে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের কঠোর বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এই মামলা প্রত্যাহারের পদক্ষেপটি রাজ্যের আপামর জনসাধারণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

 

তিনি তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে নিশ্চিত করেন যে, তিরুভান্নামালাই অঞ্চলের প্রস্তাবিত সিপকট শিল্পাঞ্চল এবং পরানদুর এলাকায় নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে যে প্রান্তিক কৃষকেরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তাদের ওপর প্রয়োগ করা অত্যন্ত কঠোর ও বিতর্কিত 'গুন্ডা আইন'-এর অধীনস্থ সমস্ত মামলাও এই আদেশের ফলে পুরোপুরি বাতিল বলে গণ্য করা হবে।

 

তবে জনবান্ধব ও ইতিবাচক এই ঘোষণার পরপরই তামিলনাড়ু রাজ্য বিধানসভার ভেতরে এক চরম উত্তপ্ত ও নাটকীয় বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে পরিচিত ডিএমকে-এর শীর্ষ নেতারা বর্তমান সরকারের এই আকস্মিক পদক্ষেপের পেছনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেন।

 

বিধানসভার অধিবেশনে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলের প্রভাবশালী হুইপ ই. ভি. ভেলু এবং সাবেক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এম. আর. কে. পান্নিরসেলভম বর্তমান সরকারের নীতি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন।

 

তারা অত্যন্ত জোরালো ভাষায় দাবি করেন যে, বর্তমান টিভিকে সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম একশ দিনের মাথায় কৃষকরা যখন ফসল ঋণের দাবিতে নতুন করে আন্দোলন শুরু করেছেন, তখন সেই আন্দোলনকারী কৃষকদের ওপরও বেশ কিছু নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে।

 

বিরোধীদের দাবি, সরকার যদি সত্যিই কৃষকদরদী হয়, তবে পূর্ববর্তী মেয়াদের মামলার পাশাপাশি বর্তমান সময়ের এই চলমান কৃষক অসন্তোষের কারণে দায়ের হওয়া মামলাগুলোও অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

 

বিধানসভার অভ্যন্তরে বিরোধীদের এই প্রবল আপত্তি ও হট্টগোলের মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন স্পিকার জে. সি. ডি. প্রভাকর। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বিরোধী দলীয় সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্মরণ করিয়ে দেন যে, মুখ্যমন্ত্রী সম্পূর্ণভাবে বিধানসভার সমস্ত নিয়মকানুন, আইনি কার্যবিধি এবং সাংবিধানিক রীতি মেনেই এই মামলা প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন।

 

স্পিকারের এই বক্তব্যের পরপরই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে আলোচনায় অংশ নেন বিধানসভার বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা উদয়নিধি স্টালিন। তিনি তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস টেনে এনে অত্যন্ত তথ্যবহুল এক বক্তব্যে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তাদের দল ডিএমকে যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছিল।

 

উদাহরণস্বরূপ তিনি উল্লেখ করেন যে, ডিএমকে সরকারের আমলেই পরিবেশ বিধ্বংসী হাইড্রোকার্বন প্রকল্প, বিতর্কিত কুডানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, বহুল আলোচিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের চাপিয়ে দেওয়া বিতর্কিত কৃষি আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সাধারণ জনতার ওপর থেকে পাঁচ হাজারেরও বেশি মামলা নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

 

অধিবেশনের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে বিতর্ক আরও কিছুটা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে। বর্তমান সরকারের পূর্তমন্ত্রী আধব অর্জুনের উত্থাপিত একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবির সরাসরি জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা উদয়নিধি স্টালিন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত বিধানসভার সামনে উপস্থাপন করেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, কুডানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনের সময় বর্তমান সরকারের মন্ত্রী ভ্যানিয়ারাসুইয়ের বিরুদ্ধেও যে গুরুতর মামলা দায়ের করা হয়েছিল, সেটি ডিএমকে সরকারের আমলেই সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

 

উদয়নিধি স্টালিনের দাবি, এই ঘটনাই হলো ডিএমকে সরকারের মামলা প্রত্যাহারের সবচেয়ে বড় ও জ্বলন্ত প্রমাণ। রাজনৈতিক এই পাল্টাপাল্টি যুক্তি, ঐতিহাসিক তথ্য উপস্থাপন এবং তীব্র বিতর্কের মধ্য দিয়ে তামিলনাড়ুর বিধানসভায় দিনটি অত্যন্ত ঘটনাবহুল হয়ে ওঠে।

 

তবে রাজনৈতিক মতপার্থক্য যাই থাকুক না কেন, চূড়ান্তভাবে সাধারণ কৃষক ও শিক্ষকদের মামলা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্তটি একটি বড় ধরনের সামাজিক ও আইনি বিজয় হিসেবেই তামিলনাড়ুর সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হচ্ছে।

 

- টাইমস নাউ