শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার মূলে ইরানে আগ্রাসন

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় কূটনীতির ওপর জোর শাহবাজ শরীফের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:১৪ এএম

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় কূটনীতির ওপর জোর শাহবাজ শরীফের
ছবি : File Photo

কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর আলোকপাত করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ।

 

মঙ্গলবার দেওয়া তাঁর এই তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের মূল কারণ হিসেবে চলতি বছরের শুরুতে সদস্য রাষ্ট্র ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের বিষয়টিকে তিনি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেন।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান নানামুখী উত্তেজনার মধ্যে তাঁর এই বক্তব্য অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। শাহবাজ শরীফ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে, সামরিক সংঘাত বা আগ্রাসন কখনোই কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বয়ে আনতে পারে না, বরং আলোচনার টেবিলে বসে কূটনীতির মাধ্যমেই কেবল টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

 

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিশ্বনেতাদের সামনে বক্তব্য উপস্থাপনকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে তুলে ধরেন যে, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সম্প্রতি যে অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার শিকার হয়েছে, তা কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন নয়, বরং এটি সমগ্র অঞ্চলে এক ভয়াবহ অস্থিতিশীলতার জন্ম দিয়েছে।

 

তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বা ভৌগোলিক অখণ্ডতায় হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থী। এই ধরনের আগ্রাসন মধ্যপ্রাচ্যের মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর অঞ্চলে যে গভীর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের সৃষ্টি করেছে, তার ঢেউ এখন বিশ্বব্যাপী অনুভূত হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে তিনি বলেন, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও অখণ্ডতার স্বীকৃতি ছাড়া কোনোভাবেই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই আঞ্চলিক সংকটের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে শাহবাজ শরীফ বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান দুর্দশার চিত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি ব্যাখ্যা করেন, মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট এই বিশাল সংকটের ফলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনপথ ও বাণিজ্য রুটগুলো হয় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, নতুবা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জীবিকা ও দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর।

 

বিশেষ করে পাকিস্তানসহ বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশ এই পরিস্থিতির কারণে অবর্ণনীয় নেতিবাচক পরিণতির শিকার হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

সংকট উত্তরণের পথ নির্দেশ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত জোরালো ভাষায় কূটনীতির ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান। তিনি পুনরুল্লেখ করেন যে, পাকিস্তান সর্বদাই শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে একটি অত্যন্ত অবিচল অবস্থান গ্রহণ করে আসছে।

 

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক যেকোনো ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের গঠনমূলক ভূমিকা অব্যাহত রাখতে তাঁর দেশ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। আন্তরিকতার সঙ্গে যেকোনো সমঝোতা বা সংলাপকে সহজতর করার ক্ষেত্রে পাকিস্তান পিছপা হবে না বলে তিনি বিশ্বনেতাদের আশ্বস্ত করেন।

 

এই প্রসঙ্গে তিনি ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলেন, এই চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বহুল আলোচিত পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিদেশীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়েও সম্মেলনে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেন শাহবাজ শরীফ। কোনো ধরনের বিভ্রান্তির অবকাশ না রেখে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, এই চুক্তিটি তার অন্তর্নিহিত স্বভাব ও কাঠামোগত দিক থেকেই সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক।

 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোনো বিশেষ রাষ্ট্র বা জোটের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানোর উদ্দেশ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। বরং, এটি সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার একটি সম্মিলিত প্রয়াস মাত্র।

 

কোনো ধরনের নতুন সংঘাত সৃষ্টি বা আঞ্চলিক বিভাজন রেখা টেনে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা এই চুক্তির পেছনে নেই বলে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিশ্চিত করেন। বক্তব্যের শেষাংশে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও সংবেদনশীল ভাষায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা এবং পশ্চিম তীরের বর্তমান মর্মান্তিক পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষের ওপর চলমান আগ্রাসন ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি অবিলম্বে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

 

একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ব সম্প্রদায়ের যে আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা পূরণে তাদের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নীরবতা পরিহার করে ফিলিস্তিনিদের প্রতি মানবিক সহায়তার হাত প্রসারিত করার মাধ্যমেই কেবল আন্তর্জাতিক ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।

 

- পার্সটুডে