বিশেষ করে দামোদর ভ্যালি করপোরেশন বা ডিভিসি এবং কংসাবতী বাঁধ কর্তৃপক্ষ ক্রমবর্ধমান পানির চাপ সামলাতে না পেরে পর্যায়ক্রমে পানি ছাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে দামোদর অববাহিকা ও সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলগুলোতে যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ প্লাবন দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তর।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানা গেছে, অতি ভারী বৃষ্টির কারণে নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় ডিভিসি তাদের মাইথন এবং পাঞ্চেত বাঁধ থেকে পানি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
বৃহস্পতিবার মাইথন বাঁধ থেকে আরও প্রায় এক লাখ বিশ হাজার কিউসেক পানি নতুন করে ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ডিভিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাঁধগুলোর জলগ্রহণ অঞ্চলে বা অববাহিকায় গত কয়েক দিন ধরে অবিরাম ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
একই সঙ্গে পার্শ্ববর্তী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের তেনুঘাট বাঁধ থেকেও বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে আসছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং বৃষ্টির পানির কারণে মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধারের ওপর ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
বাঁধের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই বিপুল জলরাশি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কর্তৃপক্ষের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। পানি ছাড়ার এই সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া, হুগলি, বাঁকুড়া এবং পূর্ব বর্ধমান জেলার দামোদর নদ-তীরবর্তী এলাকাগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দামোদরের পাশাপাশি মুণ্ডেশ্বরী এবং রূপনারায়ণ নদের তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকাতেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দামোদর ভ্যালি রিজার্ভয়ার রেগুলেটিং কমিটি বুধবার সন্ধ্যা থেকেই পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এই পানি ছাড়ার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আসন্ন এই সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ডিভিসির পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার, সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর প্রশাসন এবং বিশেষ করে আসানসোলের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আগাম বার্তা দেওয়া হয়েছে।
নিম্ন দামোদর অববাহিকায় সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত রাখার জন্যও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি এবং পানিপ্রবাহের মাত্রা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যার ভিত্তিতে পরবর্তীতে পানি ছাড়ার পরিমাণ কমানো বা বাড়ানো হতে পারে বলে কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
অন্যদিকে, দামোদরের পাশাপাশি কংসাবতী নদীর পরিস্থিতিও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। বাঁকুড়া জেলায় অবস্থিত মুকুটমণিপুর বাঁধ থেকেও পানি ছাড়ার পরিমাণ একধাপে অনেকটা বাড়িয়েছে কংসাবতী কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, বুধবার এই বাঁধ থেকে প্রতি সেকেন্ডে দশ হাজার কিউসেক হারে পানি ছাড়া হচ্ছিল।
কিন্তু উজানে বৃষ্টির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার তা বৃদ্ধি করে পনেরো হাজার কিউসেক করা হয়েছে। কংসাবতীর উচ্চ অববাহিকায় টানা বৃষ্টির কারণে মুকুটমণিপুর জলাধারে পানির স্তর দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই বাঁধটির সর্বোচ্চ পানি ধারণক্ষমতা চারশো চৌত্রিশ ফুট। বুধবারই সেখানে পানির উচ্চতা চারশো একত্রিশ দশমিক ত্রিশ ফুটে গিয়ে পৌঁছায়। এরপরও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় বাঁধের সার্বিক নিরাপত্তা ও কাঠামোগত স্থায়িত্ব বজায় রাখতে পানি ছাড়ার পরিমাণ বৃদ্ধি করা জরুরি হয়ে পড়েছিল।
মুকুটমণিপুর বাঁধ থেকে অতিরিক্ত পানি ছাড়ার কারণে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বিনপুর, দাসপুর, ডেবরা এবং পাঁশকুড়াসহ পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার প্রবল শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অঞ্চলগুলো মূলত কৃষিনির্ভর এবং নিচু এলাকা হওয়ায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
উদ্ভূত এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে নদী ও বাঁধসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের জন্য কংসাবতী কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে, এই আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ ও নিচু এলাকার বাসিন্দাদের অতি দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে বা উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে জনসাধারণকে সতর্ক করার পাশাপাশি জরুরি সেবাদানকারী কর্মীদের প্রস্তুত রেখে সম্ভাব্য সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।