রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর আকাশপথে নিরাপত্তার চরম ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে, হঠাৎ করেই থমকে গেছে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের শত শত উড়ান, আর চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন দেশি-বিদেশি হাজার হাজার যাত্রী।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত এই আকাশপথ আকস্মিক অচল হয়ে পড়ায় গোটা অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে, জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত আনাক কারাকাতোয়া পাহাড়ের এই আগ্নেয়গিরিটি গত কিছুদিন ধরেই অস্থির হয়ে উঠছিল।
শনিবার হঠাৎ করেই সেখানে এক প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ ঘটে, যার বিকট শব্দ উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত অনুরণিত হয়। এই অকল্পনীয় মাত্রার বিস্ফোরণের পরপরই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে গনগনে উত্তপ্ত লাভা চারদিকে গড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং বিস্তীর্ণ এলাকা এক ভীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।
শনিবারের ওই তাণ্ডবের রেশ কাটতে না কাটতেই আজ রোববার ভোরে আরও দুটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। এসব ধারাবাহিক বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ঘন কালো ধোঁয়া ও ছাইয়ের বিশাল মেঘমালা বাতাসের তোড়ে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে, যা সরাসরি দেশটির রাজধানী জাকার্তার নিকটবর্তী আকাশসীমাকে মারাত্মকভাবে দূষিত ও অস্বচ্ছ করে তুলেছে।
বিমানবন্দরের রাডার ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া সতর্কবার্তায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আনাক কারাকাতোয়ার এই বিষাক্ত ধোঁয়া এবং ছাই সোয়েকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আকাশসীমায় পুরোপুরি প্রবেশ করেছে।
উড়োজাহাজের ইঞ্জিনে আগ্নেয়গিরির সূক্ষ্ম ছাই প্রবেশ করলে তা উত্তাপে মুহূর্তের মধ্যে জমাট বেঁধে ইঞ্জিন বিকল করে দিতে পারে, যা যেকোনো সময় এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এমন চরম ঝুঁকির আশঙ্কায় রোববার রাত ১টা ৩০ মিনিটের দিকে কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ বিমানবন্দরটির সব ধরনের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
রানওয়ে থেকে শুরু করে বোর্ডিং গেট-সবখানেই এখন এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। উড়ান বাতিলের কারণে যাত্রীদের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও, মানুষের জীবন ও আকাশপথের নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে প্রশাসন।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ২০৯টি যাত্রীবাহী ও কার্গো ফ্লাইট সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। টার্মিনালগুলোতে আটকা পড়েছেন প্রায় ২০ হাজার যাত্রী, যাদের অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে মেঝেতে বা চেয়ারে বসে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।
শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের ক্ষেত্রে এই ভোগান্তি অবর্ণনীয় রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক রুটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইন্দোনেশিয়া থেকে সিঙ্গাপুরে যাতায়াতকারী ফ্লাইটগুলো, যা বর্তমানে প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
এর পাশাপাশি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, কাতারের দোহা এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনি অভিমুখী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম আন্তর্জাতিক রুটগুলোর কার্যক্রমও এই অগ্ন্যুৎপাতের কারণে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের টিকিট রিফান্ড বা বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু আকাশপথেই নয়, আনাক কারাকাতোয়ার এই রোষানলে পড়ে সমুদ্রপথেও বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগ্নেয়গিরিটি যেহেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক প্রণালিতে অবস্থিত, তাই এর জ্বালামুখ থেকে নির্গত বিপুল পরিমাণ ছাই ও পাথর সমুদ্রের পানিতে পড়ে বিশাল ঢেউ বা সুনামির মতো মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
এই বাস্তব আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যবর্তী ওই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ, তেলের ট্যাংকার এবং মাছ ধরার ট্রলারগুলোর জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।
সমুদ্রপথে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়া এবং সম্ভাব্য সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের কারণে ওই রুট দিয়ে নৌযান চলাচল যেকোনো মুহূর্তে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া ভৌগোলিকভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ বা অগ্নিবলয়ের ওপর অবস্থিত হওয়ায় দেশটিতে প্রায়ই এ ধরনের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে থাকে। তবে আনাক কারাকাতোয়ার বর্তমান এই আগ্রাসী রূপ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ বলে মনে করছেন ভূতাত্ত্বিকরা।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থাগুলো প্রতি মুহূর্তে আগ্নেয়গিরির গতিবিধি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এবং আকাশসীমা শতভাগ ছাইমুক্ত ও নিরাপদ ঘোষণা না করা পর্যন্ত সোয়েকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রশাসন আটকে পড়া যাত্রীদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছে এবং সামুদ্রিক এলাকার উপকূলবর্তী বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে।