এই অমানবিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার ওই তরুণীর নাম রিয়া তালুকদার। অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এই অপরাধের ভয়াবহতা পুরো ভারতজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। পুলিশি তল্লাশিতে নিহত তরুণীর বিচ্ছিন্ন মস্তক তাদেরই বাসার রেফ্রিজারেটর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চরমভাবে হতবাক করেছে।
এই হৃদয়বিদারক ও পৈশাচিক ঘটনার মূল অভিযুক্ত হিসেবে নিহত নারীর স্বামীকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বর্তমানে তাকে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এই বীভৎস ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচার করছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিস্তারিত প্রতিবেদনের সূত্রে জানা যায়, গুয়াহাটির ওই নির্দিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা গত কয়েকদিন ধরেই একটি অদ্ভুত ও উৎকট দুর্গন্ধ পাচ্ছিলেন। রোববার সেই দুর্গন্ধ অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছালে প্রতিবেশীরা বাধ্য হয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুলিশের একটি চৌকস দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশকে জানান যে, মাত্র কয়েক মাস আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ওই নবদম্পতিকে গত দুই দিন ধরে এলাকার কেউ বাড়ির বাইরে বের হতে বা দৈনন্দিন কাজে অংশ নিতে দেখেননি।
এমনকি তাদের উভয়ের ব্যক্তিগত মুঠোফোনও রহস্যজনকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল, যা প্রতিবেশীদের মনে এক গভীর সন্দেহ ও দুশ্চিন্তার জন্ম দেয়। সামাজিক বিচ্ছিন্নতার এই বিষয়টি পুলিশের তদন্তের প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ দেখতে পায় যে বাড়ির মূল ফটকটি ভেতর থেকে মজবুতভাবে তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ও আইনি নিয়মকানুন মেনে তাৎক্ষণিকভাবে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিজ্ঞ সদস্যরা।
বাসার ভেতরে প্রবেশ করতেই এক বীভৎস, অমানবিক ও শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য তাদের চোখে পড়ে। ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল ওই তরুণীর মস্তকবিহীন ও খণ্ডবিখণ্ড মরদেহ। নিষ্ঠুরতার চরম সীমা অতিক্রম করে ঘাতক নিহতের হাতের আঙুলগুলোও আংশিকভাবে কেটে ফেলেছিল, যা অপরাধীর চরম বিকৃত মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
পুলিশ জানিয়েছে, বদ্ধ ঘরে পড়ে থাকার কারণে মরদেহটিতে ইতোমধ্যে মারাত্মকভাবে পচন ধরতে শুরু করেছিল। তবে মরদেহের সাথে মাথা না থাকায় তদন্তকারী দল তাৎক্ষণিকভাবে পুরো বাড়ি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
ব্যাপক তল্লাশির এক পর্যায়ে পুলিশ রান্নাঘরে থাকা রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজটি খুললে সেখানে রাখা একটি পলিথিন ব্যাগের ভেতর থেকে নিহত রিয়া তালুকদারের বিচ্ছিন্ন মস্তক উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এমন একটি পাশবিক অপরাধ সংঘটিত হলেও ঘটনার পর থেকে নিহতের স্বামীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
স্থানীয় প্রতিবেশীরা পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে নিশ্চিত করেছেন যে, তারা গত শুক্রবার ওই ব্যক্তিকে সর্বশেষবারের মতো এলাকায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে দেখেছিলেন। এরপর থেকেই তিনি সম্পূর্ণভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান।
পুলিশের ধারণা ছিল, প্রমাণ নষ্ট করার সুযোগ না পেয়ে সে দ্রুত আত্মগোপন করেছে। রোববার এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের খবর গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও চারপাশের প্রবল চাপের মুখে অবশেষে রোববার গভীর রাতে অভিযুক্ত স্বামী আসাম রাজ্য পুলিশের কাছে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে অভিযুক্তকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রেখে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হচ্ছে।
ঠিক কী কারণে এমন চরম নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নিয়ে নিজের স্ত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, তা উদঘাটনে পুলিশের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যে নিহত রিয়া তালুকদারের বিচ্ছিন্ন মাথাসহ খণ্ডিত মরদেহের যাবতীয় অংশ ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় সরকারি চিকিৎসালয়ের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে।
ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে এলে হত্যার প্রকৃত সময়, মৃত্যুর কারণ ও পদ্ধতি সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে বলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে এ ধরনের বীভৎস ও টুকরো করে হত্যার বেশ কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় সামাজিক নিরাপত্তা এবং পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
আসাম পুলিশ এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে বিস্তারিত আইনি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।