সোমবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
চীনের নতুন প্রতিরক্ষা আইন

যুদ্ধের জন্য নাগরিকদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ চীনের, গভীর উদ্বেগে ভারত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম

যুদ্ধের জন্য নাগরিকদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ চীনের, গভীর উদ্বেগে ভারত
ছবি : Collected

চীনের জাতীয় প্রতিরক্ষা সংহতি আইনে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন আইনি কাঠামোর আওতায় এখন থেকে কেবল সেনাবাহিনী নয়, জরুরি প্রয়োজনে দেশের বেসামরিক নাগরিক, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সম্পদকে সরাসরি প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

 

আগামী ১ অক্টোবর থেকে দেশজুড়ে নতুন আইনটি কার্যকর হবে। ২০১০ সালের পর এটিই সবচেয়ে বড় সংশোধনী, যা চীনের ভবিষ্যৎ সমরকৌশল ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বিশাল পালাবদল।

 

চীনের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটি গত ২৮ আগস্ট আইনটির অনুমোদন দেয়। এতে ১৪টি অধ্যায় ও ৮২টি ধারা রয়েছে। পূর্ববর্তী আইনে ৭২টি ধারা ছিল, যার সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে নতুন ১০টি ধারা যুক্ত করা হয়েছে।

 

এই ব্যাপক আইনি সংশোধনের মূল লক্ষ্য হলো আধুনিক যুদ্ধের নিয়ত পরিবর্তনশীল ধরন, জাতীয় নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং সামরিক ও বেসামরিক সম্পদের মধ্যে নিশ্ছিদ্র সমন্বয় গড়ে তোলা।

 

সংশোধিত আইনি কাঠামোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো, যুদ্ধ বা জাতীয় বিপর্যয়ের সময় বেসামরিক সম্পদকে অত্যন্ত দ্রুত সামরিক কাজে ব্যবহারের আইনি ভিত্তি তৈরি করা। দেশের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন, সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নত প্রযুক্তি ও কৌশলগত সম্পদকে মুহূর্তের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যাবে।

 

ফলে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকেও সামরিক শক্তিতে রূপান্তরের অবারিত সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশাল তথ্যকেন্দ্র, চালকবিহীন বিমান, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রকৌশল এবং কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগুলো বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহে এই প্রযুক্তিগুলোর ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ঠিক এই জায়গাতেই চীন তার বেসামরিক প্রযুক্তি খাতের বিশাল সক্ষমতাকে সরাসরি সামরিক শক্তিতে রূপান্তরের পথ সুগম করল।

 

নতুন আইনে দেশের নাগরিকদের সরাসরি জাতীয় প্রতিরক্ষা সংহতির আওতায় আনার বিধান রাখা হয়েছে। জরুরি সামরিক অভিযান, দুর্যোগ মোকাবিলা বা অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার মতো পরিস্থিতিতে ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারীদের রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে যেকোনো মুহূর্তে তলব করার ক্ষমতা সরকারের থাকবে।

 

একই সঙ্গে জরুরি প্রয়োজনে যেকোনো নাগরিকের বাড়িঘর, ভবন, যানবাহন বা সরঞ্জাম অত্যন্ত সীমিত ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় কাজে অধিগ্রহণের আইনি ক্ষমতাও সরকারের থাকবে। এই পরিবর্তনের ফলে চীনের সামরিক ও বেসামরিক সমন্বয়ের ধারণাটি বহুগুণে শক্তিশালী হচ্ছে।

 

যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অস্ত্র উৎপাদন থেকে শুরু করে সার্বিক যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাতগুলোকে সামরিক প্রয়োজনের সঙ্গে অত্যন্ত দ্রুত যুক্ত করা যাবে। চীনের এই আইনি পরিবর্তন প্রতিবেশী ভারতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। লাদাখ ও অরুণাচল সীমান্ত নিয়ে কয়েক দশক ধরে গভীর বিরোধ চলে আসছে।

 

বিশেষ করে ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর উভয় দেশই সীমান্তে বিপুল সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। এমতাবস্থায় চীনের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসামরিক সম্পদকে যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের নতুন ব্যবস্থা ভারতের কৌশলগত নীতিনির্ধারকদের গভীর দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।

 

ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা সীমান্ত এলাকাগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও রসদ সরবরাহের সঙ্গে এই নতুন আইনের সম্ভাব্য প্রভাব গভীরভাবে মিলিয়ে দেখছেন। তবে ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষকেরা মনে করেন, আইন সংশোধন হয়েছে বলেই চীন শিগগিরই সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে-এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই যুক্তিসংগত নয়।

 

চীনা কর্তৃপক্ষের মতে, আইনটির মূল উদ্দেশ্য প্রতিরক্ষা সংহতির আধুনিকায়ন এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সম্পদের সুষম সমন্বয়। একই ধরনের আইনি কাঠামো বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই বিদ্যমান। তাই একে সরাসরি সামরিক অভিযানের ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা করা মোটেও সঠিক নয়।

 

তবে আঞ্চলিক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য যেকোনো সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্রে আইনটির কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সংঘাত শুরু হলে, চীনকে কেবল নিয়মিত সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করলেই চলবে না; বরং বেসামরিক নৌযান, পরিবহন, চালকবিহীন বিমান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাকেও কাজে লাগাতে হবে।

 

নতুন প্রতিরক্ষা আইন সেই সর্বাত্মক প্রস্তুতির ভিতকেই সুদৃঢ় করছে। সার্বিকভাবে বিচার করলে, নতুন প্রতিরক্ষা সংহতি আইনটি কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক সংশোধন নয়। এটি মূলত এমন একটি সুপরিকল্পিত কাঠামো, যার মাধ্যমে প্রয়োজনের মুহূর্তে চীনের বিশাল বেসামরিক অর্থনীতি, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও মানবসম্পদকে রাতারাতি সামরিক সক্ষমতায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে। ভারতসহ সমগ্র ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য এই আইনি সংশোধনের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সুগভীর একটি কৌশলগত বার্তা দেওয়া হয়েছে।

 

- আনন্দবাজার, ইন্ডিয়া টুডে