সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে মুখ্যমন্ত্রীর এই জোরালো অবস্থানের বিষয়টি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গণমাধ্যমে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
রাজ্যের শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার পর থেকে তিনি সমাজ সংস্কারে যে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে আসছেন, এই বক্তব্য তারই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
রাজ্য বিধানসভায় দেওয়া এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রাজ্যের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করেন যে, আজ তিনি যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সাফল্যের শিখরে অবস্থান করছেন, তার পেছনে রাজ্যের সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নারীদের অসামান্য ও অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে।
একজন রূপালি পর্দার তারকা থেকে শুরু করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার এই দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ যাত্রায় নারীরাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস ছিলেন। বাকস্বাধীনতার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি আইনপ্রণেতা ও সাধারণ নাগরিকদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিটি মানুষের জন্মগত ও সাংবিধানিক অধিকার হলেও, সেই স্বাধীনতার নামে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা বা হেয় প্রতিপন্ন করার অধিকার কারও নেই।
রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে গিয়ে নারীদের সম্মানহানি করা অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ বলে তিনি মন্তব্য করেন। সমসাময়িক সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে থালাপতি বিজয় বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে এক ধরনের অশ্লীলতা, বিদ্বেষ এবং কুরুচিপূর্ণ সংস্কৃতি মারাত্মকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
জনসমক্ষে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের নিয়ে অত্যন্ত মানহানিকর, দ্ব্যর্থবোধক এবং অশালীন বাক্যবাণ নিক্ষেপ করা হচ্ছে, যা গোটা সমাজ অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় বলেন, যারা এসব কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছেন, তাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে তাদের নিজেদের ঘরেও মা, বোন এবং কন্যারা রয়েছেন।
পারিবারিক মূল্যবোধ ও শিষ্টাচারের কথা মাথায় রেখে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে সবার ভাষা ব্যবহারে সর্বোচ্চ সংযম ও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, নারীদের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের শ্লীলতাহানি বা মৌখিক অপমানের ক্ষেত্রে প্রশাসন সম্পূর্ণ শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করবে এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রীর এই অত্যন্ত কড়া সতর্কবার্তাটি এমন এক সময়ে এল, যখন তামিলনাড়ুর রাজ্য রাজনীতিতে নারীদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য নিয়ে এক ধরনের চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
মাত্র কয়েকদিন আগেই রাজ্যের প্রভাবশালী বিরোধীদলীয় নেতা উদয়নিধি স্টালিনের বিরুদ্ধে প্রখ্যাত তামিল অভিনেত্রী ত্রিশাকে নিয়ে পরোক্ষ ও অত্যন্ত অবমাননাকর মন্তব্য করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে, যা রাজ্যজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।
গত আগস্ট মাসে কাবেরী নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় উদয়নিধি স্টালিন কিছু দ্ব্যর্থবোধক ও আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়। যদিও তাঁর দল ডিএমকের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে।
দলটির আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়, গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওচিত্রটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে এবং উদয়নিধি তাঁর বক্তব্যে নির্দিষ্টভাবে কোনো অভিনেত্রীর নামও উল্লেখ করেননি।
এই বিতর্কিত ঘটনার জেরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে সাময়িকভাবে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও, পরবর্তীতে মাদ্রাজ হাইকোর্টের নির্দেশে তিনি মুক্তি লাভ করেন। তবে এই ঘটনা রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, তা প্রশমিত করতেই মুখ্যমন্ত্রী বিজয় এমন কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
নারী অবমাননার এই ঘৃণ্য রাজনীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে থালাপতি বিজয় তাঁর ভাষণে এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর অতীত ঘটনার অবতারণা করেন। তিনি বলেন, ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, অতীতে এই একই পবিত্র বিধানসভা কক্ষে রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও প্রখ্যাত নেত্রী জে. জয়ললিতাকে চরমভাবে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল, যা তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে আজও চিহ্নিত হয়ে আছে।
সেই একই মানসিকতার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে সম্প্রতি কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ আবারও নারীদের নিয়ে নানা দ্ব্যর্থবোধক, উসকানিমূলক ও কুরুচিপূর্ণ কথা বলে সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার হীন অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।
তবে মুখ্যমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করেন যে, রাজ্যের সাধারণ ও সচেতন নাগরিকেরা এসব রাজনৈতিক চালবাজি, উসকানি এবং সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের কৌশল অত্যন্ত নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করছেন। সঠিক সময়ে জনগণই এর সমুচিত জবাব দেবে।
পরিশেষে তিনি রাজ্যের সকল রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের প্রতি দলমত নির্বিশেষে নারীদের সর্বোচ্চ সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একযোগে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান, যাতে তামিলনাড়ু সমগ্র বিশ্বের কাছে একটি আধুনিক, প্রগতিশীল ও নারীবান্ধব রাজ্য হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।